Share
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়েছে তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ, অন্তর্বর্তী শাসন-পর্ব এবং অর্থনৈতিক চাপে বিপর্যস্ত রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতর এই মন্ত্রিসভা গঠন তাই শুধু প্রশাসনিক ঘটনা নয়—বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিশেষ করে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ—রাষ্ট্রক্ষমতার তিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এ কি নিছক দক্ষতার ভিত্তিতে নির্বাচন, নাকি এর ভেতরে কাজ করছে সুস্পষ্ট “ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর”?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: কূটনীতির দিকচিহ্ন কোথায়? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে ভারসাম্যকেন্দ্রিক—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”। কিন্তু নতুন মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তির অতীত কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, দিল্লিমুখী নীতি-অভিজ্ঞতা এবং আঞ্চলিক সংলাপে সক্রিয় ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন— দিল্লির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে পূর্ব যোগাযোগ। সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সংলাপে সম্পৃক্ততা; আঞ্চলিক জোট রাজনীতিতে বাস্তববাদী অবস্থান; এসবই ইঙ্গিত দেয়, নতুন সরকার প্রথম পর্যায়ে ভারত–এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখাকেই অগ্রাধিকার দিতে পারে।
কারণ বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের বাণিজ্য, জ্বালানি, ট্রানজিট ও সীমান্ত নিরাপত্তা—সবখানেই দিল্লির প্রভাব অস্বীকারযোগ্য নয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: নিরাপত্তা সহযোগিতা না নির্ভরতা?
স্বরাষ্ট্র খাত সবসময়ই আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। জঙ্গিবাদ দমন, সীমান্ত অপরাধ, মানবপাচার, বিচ্ছিন্নতাবাদ—এসব ইস্যুতে ঢাকা–দিল্লি সহযোগিতা বহুদিনের।
নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অতীত ভূমিকা নিয়ে আলোচনার মূল পয়েন্টগুলো—সীমান্ত নিরাপত্তা সমন্বয়; যৌথ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়; আন্তঃরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা।
সমালোচকদের প্রশ্ন: নিরাপত্তা সহযোগিতা কতটা পারস্পরিক, আর কতটা একমুখী? তাদের মতে, অতিরিক্ত নির্ভরতা অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন—বর্তমান ভূরাজনীতিতে নিরাপত্তা সমন্বয় ছাড়া বিকল্প নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়: উন্নয়ন অর্থনীতি না ভূরাজনৈতিক অর্থনীতি? অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তির আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, আঞ্চলিক অবকাঠামো বিনিয়োগ কাঠামোয় সম্পৃক্ততা এবং বহুপাক্ষিক অর্থায়ন আলোচনায় ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন দাঁড়িয়ে—ঋণচাপ, রিজার্ভ সংকট, মুদ্রা অবমূল্যায়ন, বাজেট ঘাটতি— এই বাস্তবতায় দিল্লি-ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর, জ্বালানি আমদানি, ট্রানজিট রাজস্ব—এসব খাতে সহযোগিতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
“ভারত ফ্যাক্টর”: বাস্তবতা না রাজনৈতিক বয়ান? বাংলাদেশের রাজনীতিতে “ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর” নতুন নয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ সহযোগিতা
সীমান্ত ও নিরাপত্তা সমঝোতা
নদী ও পানি কূটনীতি
আঞ্চলিক বাণিজ্য
ফলে যে কোনো সরকার গঠনে দিল্লির অবস্থান বিশ্লেষণে আসবেই।
তবে বিশ্লেষকরা তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—
১. কৌশলগত বাস্তববাদ: আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয়
২. অর্থনৈতিক প্রয়োজন: বাণিজ্য ও জ্বালানি নির্ভরতা
৩. রাজনৈতিক বার্তা: আন্তর্জাতিক আস্থার সংকেত
বাদ পড়া নেতারা: দলীয় ভারসাম্যের সংকেত?
মন্ত্রিসভা গঠনের আরেক আলোচিত দিক—দলীয় সিনিয়র কয়েকজন নেতার বাদ পড়া।
এখানে রাজনৈতিক বার্তা খোঁজা হচ্ছে তিনভাবে:
দলীয় প্রজন্ম পরিবর্তন
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অগ্রাধিকার
নীতিগত পুনর্বিন্যাস
দলের ভেতরের একাংশ মনে করছে—অতীতের কড়া অবস্থানধারীদের বদলে তুলনামূলক কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ বেছে নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী শাসন থেকে নতুন ক্ষমতা কাঠামো
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস–এর সময় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার যে প্রচেষ্টা ছিল, নতুন সরকার সেটিকে ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুনর্গঠন করছে।
অন্তর্বর্তী প্রশাসন ছিল “স্থিতিশীলতা মডেল”—
নতুন সরকার যাচ্ছে “ক্ষমতা সংহতি মডেল”-এ।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বড় সমীকরণ
বাংলাদেশ এখন তিন শক্তির প্রভাব বলয়ে:
ভারত
চীন
পশ্চিমা উন্নয়ন অংশীদার
এই ত্রিমুখী ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। দিল্লিমুখী ঝোঁক বাড়লে বেইজিং সমীকরণ বদলাবে, আবার উল্টোটা হলেও ঝুঁকি।
সার্বিক রাজনৈতিক বার্তা
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা তিনটি স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে—
১. কূটনীতিতে বাস্তববাদী পুনর্গঠন
২. নিরাপত্তায় আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদার
৩. অর্থনীতিতে বহুপাক্ষিক নির্ভরতা বজায়
উপসংহার
“ভারত ফ্যাক্টর” আছে কি নেই—প্রশ্নটি যতটা রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ভূরাজনৈতিক।
রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগ নয়—স্বার্থই শেষ কথা।
তাই নতুন মন্ত্রিসভা গঠনে দিল্লির ছায়া থাকুক বা না থাকুক—স্পষ্ট যে, আঞ্চলিক সমীকরণ বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়—
এই কৌশল কি কূটনৈতিক ভারসাম্য আনবে,
নাকি নতুন নির্ভরতার বিতর্ক তৈরি করবে?
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
আরো পড়ুন

