Friday, January 30, 2026

সৌদি আরব নামক ক্ষীণ সুঁতোয় যেভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ঝুলিয়ে দিয়েছে ইউনুস

Share

দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যে রেমিট্যান্স, তার প্রায় পুরোটাই এখন একটি দেশের করুণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ভয়ংকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে দীর্ঘ অবহেলা আর অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে। কিন্তু যখন দেশের মানুষ প্রত্যাশা করছিল নতুন করে সংকট মোকাবিলার, ঠিক তখনই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রমাণ করেছে যে তারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে কতটা উদাসীন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশব্যাপী পরিকল্পিত দাঙ্গা আর সহিংসতার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে, যার পরিচয় মূলত একজন সুদী মহাজন হিসেবে। বিদেশি অর্থায়নে, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে ঘটানো এই অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে নিমজ্জিত। শ্রমবাজার পরিস্থিতি তার বাস্তব উদাহরণ।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া প্রতি তিনজন বাংলাদেশি কর্মীর দুইজনই গেছেন সৌদি আরবে। সাত লাখ চুয়ান্ন হাজার মানুষ, যারা পরিবারের ভরসা, তাদের সবার ভাগ্য এখন নির্ভর করছে একটি মাত্র দেশের শ্রমবাজারের ওপর। এই পরিস্থিতি কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়। এটি এমন এক ঝুঁকি, যা যেকোনো মুহূর্তে জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

ইউনুস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সংকটের কোনো সমাধানে কাজ করার বদলে উল্টো পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, যা একসময় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য ছিল, সেখানে ২০২৫ সালে মাত্র তিন হাজার কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ গিয়েছিল, সেখান থেকে এই পতন শুধু পরিসংখ্যান নয়, লাখ লাখ পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প।

অথচ কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিদ্যমান বাজারে সম্পর্ক মজবুত করা, এগুলো তো সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু যে সরকারের নিজের অবস্থানই অবৈধ, যারা জনগণের ভোটে নয়, বরং সামরিক ক্যু আর বিদেশি মদদে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে?

তাকামল পরীক্ষার নামে যে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেটাও সরকারের অদক্ষতার প্রমাণ। ২০২৪ সালে ৫২টি পেশার জন্য যে পরীক্ষা ছিল, ২০২৫ সালে তা বাড়িয়ে ৭২টি করা হয়েছে। কিন্তু সারাদেশে মাত্র ২৭টি কেন্দ্র দিয়ে এই বিশাল চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী দালালচক্র এই সুযোগে কর্মীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় পিষ্ট হচ্ছে।

নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক পতন চলছে। ২০১৬ সালে যেখানে মোট অভিবাসনের ১৬ শতাংশ ছিল নারী, এখন তা নেমে এসেছে সাড়ে পাঁচ শতাংশে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারী অভিবাসন কমেছে প্রায় চল্লিশ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে যে নারীদের জন্য নিরাপদ আর সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার কতটা ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ আটকে আছে অদক্ষ আর স্বল্পদক্ষ শ্রমের বাজারে। ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশই ছিল স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ। পেশাজীবী কর্মী মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো দরকার ছিল। কিন্তু যে সরকারের কোনো জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নেই, তারা কেন এই কঠিন কাজে হাত দেবে?

রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী যথার্থই বলেছেন যে এক দেশকেন্দ্রিক শ্রমবাজার দীর্ঘদিনের সমস্যা। মালয়েশিয়া আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। অতিরিক্ত কর্মী পাঠানোর ফলে বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন বাজার খোঁজার দায়িত্ব পালনে সরকার, বায়রা কিংবা রিক্রুটিং এজেন্সি কেউই কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। এই অবস্থায় যখন সৌদি আরবের বাজারেও সংকট দেখা দেবে, তখন কোথায় যাবে কোটি কোটি পরিবার?

বায়রার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের উদ্বেগ খুবই বাস্তবসম্মত। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে শ্রমবাজার মূলত কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। যাদের নিজেদের বৈধতাই আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃত নয়, তারা কীভাবে অন্য দেশের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করবে?

সৌদি আরবে এখন ফ্রি ভিসায় যাওয়া কর্মীদের বড় অংশ কাজ পাচ্ছে না। চুক্তিভিত্তিক কর্মীরাও প্রতারিত হচ্ছেন। দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে অদক্ষ কর্মী। ফলে পাকিস্তান আর ভারতের শ্রমিকদের দিকে ঝুঁকছে সৌদি নিয়োগকর্তারা। এই পরিস্থিতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে সঠিক পরিকল্পনার অভাব আর দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার ফলাফল এটি।

অথচ ইউনুস সরকারের কাছে এসব বিষয় নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। তারা ব্যস্ত আছে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে, পুরনো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে আর যারা তাদের ক্ষমতায় এনেছে সেই বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট রাखতে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা তাদের কাছে কোনো অগ্রাধিকার নয়।

যে দেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর এতটা নির্ভরশীল, সেই দেশের শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে দক্ষ আর দূরদর্শী। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন সৌদি আরবের কারাগারে বন্দি। একটি দেশের ওপর ৬৭ শতাংশ নির্ভরতা মানে হলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিশাল ঝুঁকি। সৌদি আরবে যদি কোনো কারণে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, অথবা বর্তমান কর্মীদের ফেরত পাঠানো শুরু হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি মুহূর্তে ধসে পড়বে।

অবৈধ সরকারের এই অযোগ্যতা আর অদূরদর্শিতা দেশকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর সংকটের দিকে। জনগণের ভোট না নিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, জনগণের কল্যাণ তাদের লক্ষ্য হতে পারে না। বরং তারা নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতেই সব শক্তি ব্যয় করছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শ্রমবাজারের সংকট আরও গভীর হবে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমবে, লাখ লাখ পরিবার নিঃস্ব হবে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনুস আর তার দলবল সেসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত