Wednesday, February 4, 2026

এপস্টেইনের নেটওয়ার্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share

জেফ্রি এপস্টেইনের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নাম জড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু ডকুমেন্টগুলো যখন সামনে এলো, তখন বুঝলাম এই দেশে আসলে কিছুই অসম্ভব না। অধ্যাপক মাইমুল ইসলাম খান নামের এই ভদ্রলোক, যিনি জামাতে ইসলামীর শিক্ষক হিসেবে পরিচিত এবং সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন, তার জন্য ২০১০ সালে স্বয়ং এপস্টেইন রিকমেন্ডেশন লিখেছিল। এই তথ্যটা যতবার পড়ি, ততবার মাথায় একই প্রশ্ন ঘোরে যে একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, যিনি ইসলামের ধ্বজাধারী সেজে থাকেন, তিনি কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত পেডোফাইলের নেটওয়ার্কে ঢুকে গেলেন?

এপস্টেইন যে ইমেইলটা পাঠিয়েছিল, সেখানে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ল স্কুলের এসোসিয়েট ভাইস চ্যান্সেলর সিনথিয়া রিডকে দশজন স্কলারের নাম দিয়েছিল। তার মধ্যে মাইমুল খান ছিলেন একজন। আর সেই ইমেইলেরই সিসিতে ছিল হেনরি জ্যারেকির নাম। এই হেনরি জ্যারেকি নিজেও একটা প্রাইভেট আইল্যান্ডের মালিক, আর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে এপস্টেইন একজন ভিক্টিমকে সাইকো থেরাপির নাম করে তার কাছে পাঠিয়েছিল এবং সেখানে সেই মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। এই ৯২ বছরের বুড়োও সেই একই চক্রের লোক। এখন প্রশ্ন হলো, এমন একটা চক্রের ভেতর থেকে মাইমুল খানের জন্য চাকরির রিকমেন্ডেশন এসেছিল কেন? তার পরিচয় দেওয়া হয়েছিল এই বলে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এখন আমেরিকায় স্কলার এট রিস্ক হিসেবে আছেন। মুসলিম দেশে ইসলামের কথা বলা যায় না, এই ন্যারেটিভ তৈরি করে মাইমুল খানকে একজন নিপীড়িত ইসলামী চিন্তক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

এখানে একটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার। এপস্টেইন শুধু একটা বিচ্ছিন্ন অপরাধী ছিল না। তার ছিল একটা পুরো নেটওয়ার্ক, যার মধ্য দিয়ে সে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদদের সাথে সংযোগ তৈরি করতো। এই নেটওয়ার্কের কাজ ছিল প্রভাব বিস্তার করা, লোক কেনা, আর নিজের স্বার্থ হাসিল করা। মাইমুল খানের জন্য যে রিকমেন্ডেশনটা এসেছিল, সেটা হয়তো তাকে শুধু একটা চাকরি দিতে ছিল না, বরং এই নেটওয়ার্কের ভেতরে টেনে নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া ছিল। আর ২০১২ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ ফান্ড পেয়েছিলেন, যেটা হয়তো এই রিকমেন্ডেশনের ফলাফল ছিল।

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এই দেশে যা ঘটেছে, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত দাঙ্গা, যেটার পেছনে ছিল বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সমর্থন, আর সামরিক বাহিনীর নীরব সহায়তা। একটা নির্বাচিত সরকারকে সশস্ত্র হামলা আর রাস্তায় সন্ত্রাসের মাধ্যমে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে মুহাম্মদ ইউনুসকে, যার নাম নিজেও এপস্টেইন ফাইলে আছে। ইউনুস শুধু একজন নোবেল বিজয়ী সুদী মহাজন নন, তিনি এপস্টেইনের সেই নেটওয়ার্কেরই একজন সদস্য ছিলেন। তার সাথে ছিল শহিদুল আলম, আব্দুল আওয়াল মিন্টু, আর আরো অনেকে যাদের নাম এপস্টেইন ফাইলে পাওয়া গেছে।

এই পুরো ব্যাপারটা একটা বিশাল জালের মতো। এক দিকে আছে জেফ্রি এপস্টেইনের মতো অপরাধী, যার নেটওয়ার্ক দিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। অন্য দিকে আছে জামাতে ইসলামীর মতো সংগঠন, যারা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে দেশে দেশে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাত যে গণহত্যা চালিয়েছিল, সেটা তো ইতিহাস। তারপর থেকে এই সংগঠন কখনো সন্ত্রাস, কখনো রাজনীতি, কখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের শেকড় গেড়েছে। আর এখন দেখছি তাদের সাথে জড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র।

মাইমুল ইসলাম খান এখন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের আইন অনুষদের ডিন। একজন মানুষ যার জন্য জেফ্রি এপস্টেইন নিজে রিকমেন্ডেশন লিখেছে, যার সাথে হেনরি জ্যারেকির মতো পেডোফাইলের যোগাযোগ ছিল, সেই মানুষ এখন তরুণ শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। তার ছাত্র-ছাত্রীরা হয়তো গর্ব করে বলে যে তাদের স্যার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কত পরিচিত। কিন্তু এই পরিচয়ের আসল রূপটা কী, সেটা তারা জানে কিনা সন্দেহ।

এপস্টেইন ফাইলে যাদের নাম এসেছে, তারা প্রত্যেকেই একটা না একটা কারণে এই নেটওয়ার্কের সাথে জড়িত ছিল। কেউ হয়তো টাকার লোভে, কেউ ক্ষমতার লোভে, কেউ হয়তো নিজের কোনো গোপন কাজের জন্য। মুহাম্মদ ইউনুস এপস্টেইনের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন, এটা এখন প্রমাণিত। শহিদুল আলমের নামও সেখানে। এই লোকগুলো ২০২৪ সালে যে সরকার পরিবর্তনের খেলায় নেমেছিল, সেটা কোনো গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য ছিল না। এটা ছিল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য, নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য।

জামাতে ইসলামীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এরা কখনোই শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাস করেনি। ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করেছে। তারপর স্বাধীনতার পর তারা নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু পরে আবার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। এই সংগঠনের লোকেরা এখন শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। আর তাদের অনেকেই আবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা সংগঠনের সাথে জড়িত।

এখন যে অবৈধ সরকার ক্ষমতায় আছে, তার পেছনে রয়েছে এই পুরো নেটওয়ার্ক। মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি নিজেকে দরিদ্র মানুষের বন্ধু বলে দাবি করেন, তিনি আসলে একজন সুদখোর মহাজন। গ্রামীণ ব্যাংকের নামে তিনি দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে যে সুদ আদায় করেছেন, সেটা কোনো সেবা ছিল না, ছিল শোষণ। আর এখন তিনি ক্ষমতায় এসেছেন একটা অবৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে রাস্তায় রক্ত ঝরেছে, মানুষ মরেছে, সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে।

জামাত আর ইউনুসের এই জোট কোনো কাকতালীয় ব্যাপার না। এটা একটা সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ। বিদেশি শক্তি যারা বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়, তারা এই দুই পক্ষকে ব্যবহার করেছে। জামাতকে দিয়ে রাস্তায় সন্ত্রাস চালানো হয়েছে, আর ইউনুসকে দিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য মুখ তৈরি করা হয়েছে। সামরিক বাহিনী এই পুরো প্রক্রিয়ায় নীরব সমর্থন দিয়েছে, কারণ তাদেরও নিজস্ব স্বার্থ আছে।

মাইমুল ইসলাম খানের মতো লোকেরা এই পুরো খেলার একটা ছোট অংশ মাত্র। কিন্তু তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বসে তরুণ প্রজন্মকে একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। তারা ইসলামের নামে এমন সব ধারণা ছড়ায় যেগুলো আসলে মৌলবাদ আর সন্ত্রাসের জন্ম দেয়। আর একই সময়ে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন সব নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত থাকে যেগুলো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

জেফ্রি এপস্টেইনের সাথে মাইমুল খানের সংযোগটা হয়তো অনেকের কাছে একটা ছোট বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু এটা আসলে অনেক বড় একটা চিত্রের একটা অংশ। এই চিত্রে আছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র, আছে মৌলবাদী সংগঠন, আছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, আর আছে সামরিক বাহিনীর একটা অংশ। এরা সবাই মিলে একটা দেশকে ধ্বংস করার খেলায় মেতেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ঘটেছে, সেটা কোনো বিপ্লব ছিল না। সেটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান। আর এই অভ্যুত্থানের পেছনে যারা আছে, তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারবে। ইউনুস আর জামাত এই খেলার সামনের মুখ, আর পেছনে আছে আরো অনেক শক্তি যারা এখনো আড়ালে থাকতে পেরেছে।

এই পুরো ব্যাপারটা নিয়ে মানুষের জানা দরকার। জেফ্রি এপস্টেইনের নাম যখন বাংলাদেশের একজন শিক্ষকের সাথে জড়িত, তখন সেটা শুধু একটা গসিপ না, সেটা একটা গুরুতর বিষয়। মাইমুল খান কীভাবে এপস্টেইনের নেটওয়ার্কে ঢুকলেন, তিনি কী ধরনের সুবিধা পেয়েছেন, আর তার বিনিময়ে তিনি কী করেছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা দরকার। একইভাবে ইউনুস, শহিদুল আলম, মিন্টুদের ভূমিকাও তদন্ত করা দরকার।

কিন্তু এখন যারা ক্ষমতায় আছে, তারা তো এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে না। তারা নিজেরাই এই পুরো খেলার অংশ। তাই জনগণকেই সচেতন হতে হবে। বুঝতে হবে যে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ঘটেছে, সেটা কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবর্তন না। এটা একটা ষড়যন্ত্রের ফল, যার শিকড় অনেক গভীরে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত