Share
ওসমান হাদীর মৃত্যুটা খুব সুবিধাজনক সময়ে হয়েছিল। ঢাকা ০৮ আসনের প্রার্থী হিসেবে তার মৃত্যুর পরপরই নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী যেভাবে সামনে এলেন, সেটা হয় অত্যন্ত অস্বাভাবিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নয়তো আগে থেকেই পরিকল্পিত ছক। পাটোয়ারী হাদীর নাম আর সহানুভূতি ব্যবহার করলেন, কিন্তু খুব দ্রুতই নিজের ব্র্যান্ডিংয়ে মনোযোগী হয়ে উঠলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, কে চাইত হাদী সরে যাক? আওয়ামী লীগের? একই ঘরানার আরেকজনকে তৈরীর সুযোগ করে দেয়ার মতো ভুল তারা কখনোই করবে না। বিএনপির? তাহলে তো তারা পাটোয়ারীর মতো তুলনামূলক দুর্বল প্রার্থীকে নিরাপদে রাখত না, বরং মীর্জা আব্বাসকে জিতিয়ে দিতই। মীর্জা আব্বাসের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপরীতে পাটোয়ারীকে দাঁড় করানোটা নিজেই একটা রাজনৈতিক ধোঁয়াশা।
উত্তরটা লুকিয়ে আছে তৃতীয় একটি সম্ভাবনায়। এমন কোনো গোষ্ঠী যারা সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নেই, কিন্তু অস্থিরতা থেকে লাভবান হয়। যাদের লক্ষ্য ছিল নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করা, প্রশাসনে ভীতি তৈরি করা, আর ক্রমাগত সংকট বাড়িয়ে একটা পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে “বিকল্প” হিসেবে কাউকে হাজির করা যায়।
জুলাইয়ের দাঙ্গা শুধু জনরোষ ছিল না। সেটা ছিল সুসংগঠিত। একই সময়ে একাধিক শহরে, একই ধরনের টার্গেট, একই ধরনের ভাষা, একই ধরনের গুজব। এত সমন্বয় স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। পেছনে লাগে অর্থায়ন, লাগে নেটওয়ার্ক, লাগে পূর্ব-পরিকল্পনা।
জামায়াতে ইসলামী এই ধরনের খেলায় মাস্টার। তারা সরাসরি ম্যান্ডেট পায় না, কিন্তু বিশৃঙ্খলা সংগঠিত করতে জানে। ২০২৪ সালে তারা বিএনপিকে সামনে রেখে নিজেরা পেছনে থেকে কাজ করেছে। ধর্মীয় আবেগ, নৈতিকতার বুলি, আর ভিকটিমহুডের ন্যারেটিভ দিয়ে তারা সুইং ভোটারদের একটা অংশকে সরিয়ে নিয়েছে। বিএনপি যখন হিংসাত্মক আন্দোলনে ব্যস্ত, জামায়াত তখন “শান্তিপূর্ণ বিকল্প” হিসেবে নিজেদের পজিশন করার চেষ্টা করে।
আর এখানেই আসে ইউনুসের ভূমিকা। একজন নোবেলজয়ী, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য, “নৈতিক” মুখ। তাকে সামনে রাখলে পশ্চিমা দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নেবে না, মিডিয়া সহজে সমালোচনা করবে না, আর দেশের ভেতরে “সুশাসন” আর “পরিবর্তন” এর আকাঙ্ক্ষা ব্যবহার করা যাবে। এটা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। কিন্তু ইউনুস নিজে কোনো রাজনীতিবিদ নন, তার কোনো জনভিত্তি নেই। তার পেছনে কারা আছে, কাদের স্বার্থ তিনি রক্ষা করবেন, সেটাই আসল প্রশ্ন।
বিদেশি অর্থায়নের বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বাংলাদেশে এনজিও সেক্টরে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আসে। এর একটা বড় অংশ কোথায় যায়, কীভাবে খরচ হয়, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। ইসলামিক চ্যারিটির নামে যে অর্থ আসে, তার একটা অংশ যে জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কে যায়, সেটা নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানে। কিন্তু প্রমাণ করা কঠিন, কারণ এই নেটওয়ার্ক খুবই সতর্ক আর বিকেন্দ্রীভূত।
একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের জন্য আর সরাসরি ট্যাঙ্ক নামাতে হয় না। অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক লবিং, ধর্মীয় মেরুকরণ, আর সহিংস অস্থিরতা একসাথে ব্যবহার করলেই যথেষ্ট। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এই সবকটা উপাদানই একসাথে কাজ করেছে।
বিএনপি আর জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভিশাপ কারণ তাদের কাছে ক্ষমতা মুখ্য, রাষ্ট্র নয়। নির্বাচনে হারলে সেটা অবৈধ, জিতলে গণতন্ত্র। সহিংসতা হলে সেটা জনগণের ক্ষোভ, সুবিধা হলে রাজনৈতিক আন্দোলন। এই দ্বিচারিতা তাদের চরিত্রের অংশ। তারা কখনোই গণতন্ত্রের শক্ত ভিত তৈরি করেনি, বরং সংকটকে পুঁজি করে শর্টকাট পথে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
ইতিহাস পাঠ আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর দ্বিতীয় ধাপ প্রায়ই হয় সহানুভূতির রাজনীতি আর নিয়ন্ত্রিত সহিংসতা। একজনকে ভিকটিম বানানো যায়, পুরো দায় চাপানো যায় প্রতিপক্ষের ঘাড়ে, আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিজেদের এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়া যায়। ঢাকা ০৮ থেকে শুরু করে পুরো দেশজুড়ে যা ঘটেছে, সেটা এই স্ক্রিপ্টেরই অনুসরণ করেছে।
আমাদের প্রশ্ন তোলা দরকার। কারণ গণতন্ত্র ধ্বংস হয় হঠাৎ করে নয়, ধীরে ধীরে, যুক্তির আড়ালে আর নৈতিকতার বুলি শুনিয়ে। যারা আজ নিজেদের ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির করতে চায়, তাদের অতীত, তাদের স্বার্থ, তাদের পদ্ধতি খতিয়ে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভিশাপ আসে চরিত্র দিয়ে। আর সেই চরিত্র যখন বারবার সংকটকে সিঁড়ি বানিয়ে ক্ষমতার দিকে ওঠার চেষ্টা করে, তখন সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব হয়ে যায় অদৃশ্য খেলোয়াড়দের চিনে নেওয়া। নইলে ইতিহাস শুধু নিজেকে নতুন তারিখে রিপিট করবে।
আরো পড়ুন

