Share
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আল-জাজিরায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন কোনো নারী কখনো তাদের দলের প্রধান হতে পারবে না। কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন সন্তান জন্মদানের সেই পুরনো যুক্তি। এই একই লোক, একই সংগঠন কিন্তু বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রিত্ব নিতে, সংসদে বসতে কোনো সমস্যা দেখেনি। বিএনপির সাথে জোট করতে আপত্তি ছিল না। তখন তো এই ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কথা মনে পড়েনি।
আসল কথা হলো, ক্ষমতা যখন হাতের বাইরে ছিল তখন নারীনেতৃত্ব মেনে নিতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। এখন যেহেতু জুলাইয়ের রক্তস্নাত দাঙ্গার পর ইউনুসের ছায়ায় বসে আসল ক্ষমতার স্বাদ পাচ্ছে, তাই আসল চেহারা বেরিয়ে এসেছে।
এই যে তিনশো আসনে একটা নারী প্রার্থী না দেওয়া, এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। এটা একটা সুচিন্তিত বার্তা। বার্তাটা হলো – ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আজ রাজনীতিতে প্রার্থী না দেওয়া, কাল প্রশাসনে নিয়োগ কমানো, পরশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিধিনিষেধ। এভাবেই তো তালেবান শুরু করেছিল আফগানিস্তানে।
মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে দুটো প্রধান রাজনৈতিক দল আছে, দুটোরই প্রধান আছেন ও ছিলেন নারী। আওয়ামী লীগের আছে শেখ হাসিনা, বিএনপির ছিলেন খালেদা জিয়া। এই দুজন নারী এই দেশ চালিয়েছেন কয়েক দশক ধরে। যুদ্ধ করেছেন, কূটনীতি করেছেন, অর্থনীতি সামলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেছেন। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক উত্থান দেখেছে, তা তো পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় উদাহরণ হয়ে আছে। কিন্তু জামায়াতের হিসেবে এসব কিছুই না, কারণ নারী তো জন্মগতভাবেই অযোগ্য।
এই যুক্তি যদি ধর্ম থেকে আসে, তাহলে প্রশ্ন হলো কোন ধর্ম? ইসলামের ইতিহাসে হজরত আয়েশা (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন, হজরত খাদিজা (রা.) ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। ইন্দোনেশিয়ায় মেগাবতী সুকর্ণপুত্রী প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, পাকিস্তানেও বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা ধর্মে নয়, সমস্যা ক্ষমতার লোভে।
জুলাইয়ের সেই দাঙ্গাটা ঠিক কী ছিল? ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন? তাহলে কেন পুড়ল সরকারি অফিস, কেন লুট হলো ব্যাংক, কেন হামলা হলো সংখ্যালঘু পাড়ায়? কেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর চিহ্নিত করে আক্রমণ করা হলো? এত সুসংগঠিত, এত পরিকল্পিত হামলা কি স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে?
যে সংগঠন একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল, সেই সংগঠনের নেতারা আজ রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগীদার। ইউনুস সাহেব তার মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে নোবেল পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার কত ছিল সেটাও তো ভুলে গেলে চলবে না। দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে যে হারে টাকা আদায় করা হতো, সেটা তো মহাজনি ব্যবসার চেয়ে কম কিছু ছিল না। এখন সেই মহাজন বসে আছেন ক্ষমতার শীর্ষে, আর তার পেছনের শক্তি হলো জামায়াত।
বিদেশি টাকার কথা বলছেন অনেকে। কোন দেশ চায় বাংলাদেশে জামায়াত ক্ষমতায় আসুক? কারা লাভবান হবে যদি বাংলাদেশ আফগানিস্তান হয়ে যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলে অনেক কিছু পরিষ্কার হবে। কিন্তু ইউনুসের সরকার তো সেসব প্রশ্ন করতে দেবে না।
এখন নারীনেতৃত্ব নিয়ে যে কথা উঠছে, সেটা আসলে শুরু মাত্র। আফগানিস্তানে দেখা গেছে কীভাবে ধাপে ধাপে নারীদের জীবন থেকে সব কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রথমে বলা হলো মেয়েদের বোরকা পরতে হবে। তারপর বলা হলো একা বাইরে যাওয়া যাবে না। তারপর চাকরি নিষিদ্ধ। তারপর শিক্ষা বন্ধ। শেষে কথা বলাটাও অপরাধ হয়ে গেল।
বাংলাদেশে মেয়েরা এখন যেখানে আছে, সেটা কিন্তু কারো দয়ায় আসেনি। শেখ হাসিনার সরকার যতই সমালোচিত হোক, নারী শিক্ষায় বৃত্তি, কর্মসংস্থানে কোটা, উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ – এসব কিন্তু তারই আমলে হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তি ৯৮ শতাংশ – এটা কী এমনি এমনি হয়েছে? এইচএসসিতে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে – এটা কেন? কারণ তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
জামায়াত এখন সেই সুযোগটাই কেড়ে নিতে চায়। তাদের মডেল হলো সৌদি আরব, আফগানিস্তান, পাকিস্তান। সেখানে নারীদের অবস্থা কী? পাকিস্তানে অনার কিলিং হয় প্রতিদিন। আফগানিস্তানে মেয়েদের স্কুল বন্ধ। সৌদিতে সবে মাত্র নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি মিলেছে। এই হলো ওহাবি মডেল।
ইউনুস হয়তো নিজে এসব বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তিনি জানেন তার ক্ষমতার ভিত্তি কোথায়। জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার, সেই সরকারের পেছনের শক্তি হলো জামায়াত। আর জামায়াতের পেছনে আছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক, বিদেশি অর্থায়ন, আর সামরিক বাহিনীর একাংশের নীরব সমর্থন।
শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য শুধু একটা মতামত নয়, এটা একটা ঘোষণা। ঘোষণা যে বাংলাদেশকে এখন থেকে নিয়ে যাওয়া হবে অন্য পথে। যে পথে হেঁটেছে সিরিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান। যে পথের শেষ গন্তব্য হলো মধ্যযুগীয় বর্বরতা।
আরো পড়ুন

