Thursday, February 5, 2026

ভারত–যুক্তরাষ্ট্র ট্রেড ডিল: শুল্ক কমানো কি অর্থনীতির জয়, নাকি ভূরাজনৈতিক দরকষাকষি?

Share

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্থনীতি এখন আর নিছক বাণিজ্যের বিষয় নয়—এটি ক্ষমতা, কূটনীতি ও ভূরাজনীতির সরাসরি হাতিয়ার। এমন এক বাস্তবতায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক ট্রেড ডিল–সংক্রান্ত ঘোষণাটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামাতে সম্মত হয়েছে। যদিও এখনো চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ হয়নি, তবুও এই ঘোষণাই বিশ্ব রাজনীতিতে নানা প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

প্রথম দৃষ্টিতে এটি ভারতের জন্য একটি অর্থনৈতিক স্বস্তির খবর। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি সার্ভিস, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম—এই খাতগুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ট্যারিফের চাপে ছিল। শুল্ক কমলে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থনৈতিক বিচারে এটি নিঃসন্দেহে একটি লাভজনক অগ্রগতি।

তবে এই চুক্তিকে কেবল অর্থনৈতিক চশমায় দেখলে বড় ছবিটি আড়ালে পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি বরাবরই রাজনৈতিক। ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় শুল্ক আরোপ ও প্রত্যাহার—দুটিই মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল। ভারত ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর ঘোষণা তাই নিছক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একটি বৃহত্তর কৌশলগত সমঝোতার ইঙ্গিত বহন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ট্রেড ডিলের পেছনে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চীন–মার্কিন টানাপোড়েন, ইউক্রেন যুদ্ধ–পরবর্তী বৈশ্বিক মেরুকরণ, রাশিয়া ইস্যু এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত এখন কৌশলগতভাবে অপরিহার্য অংশীদার। শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ভারতের কাছ থেকে বাজার উন্মুক্তকরণ, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার কমানো কিংবা নির্দিষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান প্রত্যাশা করছে—তা অনুমান করা কঠিন নয়।

ভারতের দিক থেকেও বিষয়টি দ্বিমুখী। একদিকে সরকার এটিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবে, বিশেষ করে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্বের দাবির সঙ্গে এটি মানানসই। অন্যদিকে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ছাড়ের বিনিময়ে ভারত কতটা নীতিগত বা কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য হবে? কৃষি, ডেটা লোকালাইজেশন, ডিজিটাল ট্যাক্স কিংবা প্রতিরক্ষা ক্রয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি এখনো মূলত একটি ঘোষণা, পূর্ণাঙ্গ ও আইনি বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়। অতীতে দেখা গেছে, এমন অনেক ঘোষণাই বাস্তবায়নের স্তরে গিয়ে শর্ত, ব্যতিক্রম ও সময়সীমার জটিলতায় আটকে গেছে। ফলে এই ট্যারিফ কমানো আদৌ কবে, কীভাবে এবং কোন কোন পণ্যে কার্যকর হবে—তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত একে চূড়ান্ত সাফল্য বলা যাবে না।

সব মিলিয়ে, ভারত–যুক্তরাষ্ট্র ট্রেড ডিলের এই ঘোষণা অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও এটি মূলত শক্তির রাজনীতিরই আরেকটি অধ্যায়। এখানে লাভ যেমন আছে, তেমনি সূক্ষ্ম চাপ ও সমঝোতার হিসাবও লুকিয়ে আছে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে—অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে গিয়ে যেন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত