Tuesday, February 10, 2026

চাঁদা নাকি হাদিয়া? শব্দের মোড়কে একই খেলা

Share

জামাতের আমির বুড়ো সাদা শকুন শফিক সাহেব সকাল থেকে সন্ধ্যা একটাই কথা বলেন। জামাত আসলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। যেন এটাই তাদের একমাত্র এজেন্ডা, যেন দেশের সব সমস্যার সমাধান এই একটা লাইনে লুকিয়ে আছে। কিন্তু একবারও কি তিনি বলেছেন কিভাবে? কোন পদ্ধতিতে? কোন সিস্টেম চালু করে? না। এসবের কোনো উত্তর নেই। শুধু একটা বিশাল প্রতিশ্রুতি, যার পেছনে কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো রোডম্যাপ নেই।

মজার ব্যাপার হলো, তার এই বক্তৃতার আসল উদ্দেশ্য কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ করা নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে বিএনপিকে চাঁদাবাজ প্রমাণ করা আর নিজেদের ফেরেশতা সাজানো। এক ধরনের নৈতিক উচ্চতা দাবি করা, যেখানে নিজেদের কার্যকলাপ একদম পরিষ্কার পানির মতো আর অন্যরা সবাই কাদা-পানিতে ডুবে আছে। এটা একটা পুরনো রাজনৈতিক কৌশল। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে অন্যের দিকে আঙুল তুলে দাও।

কিন্তু বাস্তবতাটা একটু ভিন্ন। কারওয়ান বাজার থেকে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকার চাঁদা ওঠে। মাসে দেড়শো কোটি টাকা। শুধু একটা জায়গা থেকে। এখন ঢাকার মধ্যেই যাত্রাবাড়ী, গাবতলি, মিরপুর, মোহাম্মদপুরের মতো আরও কতগুলো স্পট আছে? সেখান থেকে কত টাকা ওঠে? পুরো ঢাকা শহরেই মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা। এবার সারাদেশের চিত্রটা কল্পনা করুন। এই অর্থনীতির আকার কত বিশাল হতে পারে?

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে আপনি জিবরাইল ফেরেশতাকে এনে ক্ষমতায় বসালেও কি কারওয়ান বাজারের চাঁদা বন্ধ হবে? কখনোই না। কারণ এটা এমন একটা সিস্টেম, যেটা দশকের পর দশক ধরে শিকড় গেড়ে বসে আছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য স্বার্থ। বাংলাদেশের মানুষ হঠাৎ করে এত বড় সাধু হয়ে যাবে যে হাজার কোটি টাকার এই সুযোগ পায়ে ঠেলে দেবে, এই আশা করাটাই অবাস্তব।

শফিক সাহেব বলেন চাঁদাবাজি বন্ধ করবেন। চমৎকার। কিন্তু কিভাবে করবেন? সেই ‘কিভাবে’র কোনো উত্তর আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হেন করব, তেন করব, এরকম অনেক কিছুই শোনা যায়। কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা কোথাও নেই। প্ল্যান কী? স্ট্র্যাটেজি কী? নাকি তাদের ধারণা, তাদের চেহারা দেখলেই সবাই স্বেচ্ছায় চাঁদাবাজি ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস নেবে?

গত দেড় বছরে জামাত অনেক জায়গায় চাঁদাবাজিতে জড়িত হয়েছে। এটা কোনো গোপন তথ্য নয়। এখন তারা যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই হাজার হাজার কোটি টাকার লোভনীয় উৎস তারা ছেড়ে দেবে, এমন ভাবার কোনো যুক্তি নেই। ক্ষমতায় এসে নৈতিকতার শিখরে পৌঁছে যাওয়ার ইতিহাস এই উপমহাদেশে খুব একটা দেখা যায় না।

জামাতের জোটে আছে এনসিপি। গত দেড় বছরে এনসিপি কী পরিমাণ চাঁদাবাজি করেছে তার কোনো হিসাব নেই। ব্যাংক থেকে টিভি চ্যানেল, পত্রিকা থেকে সাধারণ আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছ থেকে। এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেখানে এরা চাঁদাবাজি করেনি। এখন এদের সাথে জোট করে যারা ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা করছেন, তারা চাঁদাবাজি বন্ধের কথা বলছেন। কতটা বিশ্বাসযোগ্য শোনায়?

ইউটোপিয়ান কথাবার্তা শুনতে ভালো লাগে, এতে সন্দেহ নেই। মানুষও এসব কথায় আকৃষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবতা একেবারে আলাদা জিনিস।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে অনেক কিছুই বলা হয়েছে, আরও অনেক কিছু বলা হবে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, সেই সময় যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছিল, তার পেছনে যারাই থাকুক, তাদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিদেশি অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে, সামরিক সমর্থনের কথা বলা হয়েছে, জঙ্গি সংগঠনের সহায়তার কথাও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি, কিন্তু যতদিন না সেটা হচ্ছে, ততদিন সন্দেহের ছায়া থেকেই যায়।

ইউনুস সাহেব একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে দেশে-বিদেশে যে বিতর্ক আছে, সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। সুদের হার নিয়ে, ঋণ আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন যদি তিনি একটা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকেন, তাহলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এটাই স্বাভাবিক।

আর জামাতের কথা বলতে গেলে তো একটা পুরো অধ্যায় লিখতে হবে। তারা চাঁদা নেবে, এটা তো নিশ্চিত। কিন্তু শুধু চাঁদা কেন, ঘুষও খাবে, সুদও খাবে। তাদের কোটি কোটি টাকার কালো টাকা থাকবে। কিন্তু এই সবকিছুই এমনভাবে সাজানো হবে, এমন কৌশলে পরিচালনা করা হবে যে সাধারণ মানুষ টেরই পাবে না। টাকা তাদের চোখের সামনে দিয়ে যাবে, কিন্তু কেউ বুঝতে পারবে না যে এটা আসলে কালো টাকা।

এখানে শব্দের জাদু খুবই কাজে লাগে। বিএনপি টাকা তুললে সেটা চাঁদা, কিন্তু জামাত তুললে সেটা হাদিয়া। একই কাজ, কিন্তু দুটো আলাদা নাম। আর ‘হাদিয়ায়ে সাদাকাতুল জারিয়া’ বললে তো একদম ইসলামিক একটা আবহ তৈরি হয়ে যায়। শুনতেই মনে হয় এটা কোনো পুণ্যের কাজ। এই যে ভাষার খেলা, শব্দের মোড়কে একই জিনিসকে আলাদা করে উপস্থাপন করা, এটা একটা শিল্প। আর এই শিল্পে জামাত বেশ দক্ষ।

চাঁদাবাজি বন্ধ হবে কি না, সেটা নির্ভর করে সিস্টেমের উপর, আইনের প্রয়োগের উপর, প্রশাসনের স্বচ্ছতার উপর। শুধু একটা দল ক্ষমতায় এসেছে বলে এই জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যেখানে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা, কার্যকর আইন এবং সবচেয়ে বড় কথা, সৎ প্রশাসন। যেখানে এসবের কোনোটাই নিশ্চিত নয়, সেখানে শুধু বক্তৃতায় চাঁদাবাজি বন্ধের কথা বললেই কিছু হবে না।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যারা ক্ষমতায় আছেন বা ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন, তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে মানুষের সন্দেহ আছে, প্রশ্ন আছে। এবং সেই সন্দেহ ও প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়িত্ব তাদেরই। শুধু সুন্দর সুন্দর কথা বলে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে আর বোকা বানানো যাবে না। মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন, বেশি প্রশ্ন করে, বেশি জানতে চায়।

শফিক সাহেবের চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি শুনে ভালোই লাগে। কিন্তু যতদিন না তিনি বা তার দল একটা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিচ্ছেন, ততদিন এটা শুধুই একটা ফাঁকা বুলি থেকে যাবে। আর যে দলের নিজেদের ভেতরেই চাঁদা আদায়ের সিস্টেম আছে, সেই দল কীভাবে দেশজুড়ে চাঁদাবাজি বন্ধ করবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। প্রশ্নটা রয়ে গেল। উত্তর কোথায়?

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত