Monday, February 16, 2026

এক লক্ষ কোটি টাকার জান্নাত ব্যবসা

Share

এই লেখাটা যখন লিখছি তখন প্রথমেই যা মাথায় আসলো সেটা হলো একটা পুরনো প্রশ্ন। কত বছর ধরে শুনে আসছি “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” কিন্তু আসলে কি হলো? ধর্মটা বিগত ১৮ মাসে তো আর “যার যার” রইলো না, সেটা হয়ে গেছে একটা শিল্প। আর সেই শিল্পের কাঁচামাল হলাম আমরা, আমাদের আবেগ, আমাদের বিশ্বাস, আমাদের পকেট।

শায়খ আহমদুল্লাহকে নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা জিনিস স্বীকার করতে হবে, লোকটা চালাক। অসম্ভব রকমের চালাক। বাংলাদেশে যারা ধর্মব্যবসা করেছে তাদের বেশিরভাগই ছিলো খানিকটা গা জোয়ারি টাইপের, জামাতের মতো সরাসরি রাজনৈতিক, অথবা হেফাজতের মতো রাস্তায় নেমে হুমকি দেওয়া স্টাইলের। আহমদুল্লাহর মডেলটা ভিন্ন। উনি এসেছেন ত্রাণের ট্রাক নিয়ে, রিকশা হাতে নিয়ে, কান্নায় ভেজা চোখ নিয়ে। মানুষ যখন কাউকে নিজের হাত থেকে খাবার নিতে দেখে, স্বাভাবিকভাবেই মনে করে এই মানুষটা ভালো। এই বিশ্বাসটাই হলো সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

এক লক্ষ কোটি টাকার জাকাতের বাজার, এই সংখ্যাটা মাথায় রাখুন। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এই টাকা যদি সত্যিকারের গরিব মানুষের কাছে পৌঁছাতো, দেশের দারিদ্র্যের চিত্র ভিন্ন হতো। কিন্তু সেটা হয়নি, কারণ এই টাকার একটা বড় অংশ এখন একটা সুনির্দিষ্ট ফানেলের মধ্য দিয়ে যায়। ডিজিটাল প্রচারণা, আবেগী ভিডিও, রমজানের সওয়াবের গণনা, সব মিলিয়ে এটা আর দান নেই, এটা একটা পরিকল্পিত ফান্ড কালেকশন মেকানিজম।

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কম্পিউটার ট্রেনিং প্রোগ্রামটার কথা একটু ভাবুন। এটাকে দেখলে মনে হয় দারুণ উদ্যোগ। গরিব ছেলেপেলেদের ফ্রিল্যান্সিং শেখানো হচ্ছে, তারা আপওয়ার্ক ফাইভারে কাজ করবে, নিজেরা দাঁড়াবে। কিন্তু যখন দেখা যায় এই ট্রেনিং নেওয়া ছেলেগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তীতে একাধিক ফেক আইডি নিয়ে সুশীল সেজে বসে আছে এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ছড়ানোর কাজ করছে, তখন পুরো চিত্রটা বদলে যায়। মধু, কালোজিরার ব্যবসার আড়ালে যে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে সেটা নিছক ধর্মীয় উদ্যোগ না। এটা একটা অপারেশন।

২০২৪ সালে যা হয়েছে সেটা হঠাৎ হয়নি। উত্তরা, যাত্রাবাড়ি, শনির আখড়া, এই জায়গাগুলো এমনি এমনি সেন্সিটিভ হয়ে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে একটা পরিকল্পিত সামাজিক-ধর্মীয় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। মাদ্রাসা, ত্রাণ সংগঠন, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, সব একসাথে কাজ করেছে। আর ইউনূস ও জামায়াত সেই প্রস্তুত মাটিতেই ফসল ফলিয়েছে।

মুহম্মদ ইউনূসকে নোবেলজয়ী ব্যাংকার হিসেবে দেখানো হয়েছিলো দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু যে মানুষটা বিদেশি ফান্ডিং আর লবিংয়ের জোরে একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর ক্ষমতায় বসলো, তাঁকে “সংস্কারক” বলাটা ইতিহাসের সাথে রসিকতা। আর সেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যে জামায়াতকে পুনর্বাসিত করা হলো, যে দলটার নেতারা একাত্তরে এই দেশের মানুষ মেরেছে, সেটা শুধু রাজনৈতিক সুবিধাবাদ না, এটা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।

বাংলাদেশের সমস্যাটা এখন আর শুধু রাজনৈতিক না। এটা হয়ে গেছে একটা দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক সংকট। যে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একসময় মানুষের পরিচয়ের অংশ ছিলো, সেই দেশে এখন যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীরা “ইনসাফ” এবং “সৎ শাসন” এর কথা বলছে। আর মানুষ শুনছে, কারণ বিকল্পটা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে এই দেশের প্রগতিশীল অংশ।

ধর্মব্যবসাটা এই দেশকে ঠিক এখানে নিয়ে এসেছে। টাকাটা আপনার, বিশ্বাসটা আপনার, কিন্তু সেই টাকা আর বিশ্বাস দিয়ে যা তৈরি হলো সেটা আপনার না। সেটা একটা মেশিনের জ্বালানি যেটা চলে অন্য কারো স্বার্থে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত