Share
রিজওয়ানা হাসান গত দেড় বছরে কী করেছেন, সেটা নিয়ে আলাপ করার আগে একটাই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। এই মাসের দুই তারিখে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যে সংবাদ সম্মেলন করল, সেটা কি উনি দেখেননি? নাকি দেখেছেন, কিন্তু ভেবেছেন মানুষ মনে রাখবে না?
TIB বলছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫, এই এক বছর পাঁচ মাসে সাংবাদিকদের হয়রানির ৪৯৭টি আলাদা আলাদা ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ১০৪ জন সরাসরি হয়রানির শিকার, ২০৪ জনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে, ৩০ জনকে গ্রেফতার করে এখনো জামিন দেওয়া হয়নি। এই সংখ্যাগুলো কোনো বিরোধী দলের প্রচারপত্র থেকে নেওয়া না। এগুলো TIB-এর, যে সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এই সরকার নিজেও কখনো প্রশ্ন তোলেনি।
রিজওয়ানা হাসান এই সংখ্যাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন মতপ্রকাশের জন্য কাউকে জেলে যেতে হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, ওই ৩০ জন সাংবাদিক কোন অপরাধে জেলে? তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী? এবং সেই অভিযোগ যদি এতটাই গুরুতর হয়, তাহলে জামিন আটকে রাখার কারণ কী? বাংলাদেশের আইনে জামিন একটা অধিকার, অনুগ্রহ না। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, আর সরকারের তথ্য উপদেষ্টা বলছেন কাউকে জেলে যেতে হয়নি।
১৮৯ জন সাংবাদিককে জোর করে চাকরি থেকে সরানো হয়েছে। আটটি সংবাদপত্রের সম্পাদক আর এগারোটি টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান বরখাস্ত হয়েছেন। ২৯টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল হয়েছে। দেশের দুটো প্রধান দৈনিকে আগুন দেওয়া হয়েছে দিনের আলোয়, এবং সম্পাদক নূরুল কবীর নিজে বলেছেন, সেই রাতে সরকারের কেউ ফোন ধরেননি, কেউ সাহায্য করেননি। জনকণ্ঠের মতো পুরনো একটা পত্রিকা কার্যত দখল হয়ে গেছে। এই পুরো চিত্রটাকে যদি “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে” বলে বর্ণনা করা যায়, তাহলে ভাষার সাথে এর চেয়ে বড় প্রতারণা আর কী হতে পারে?
তবে রিজওয়ানা হাসানকে শুধু তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার ভূমিকায় বিচার করলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। কারণ তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন, আর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল তার হাতে। পরিবেশ নিয়ে তার উদ্বেগ বহু পুরনো, বহু প্রচারিত। সেই উদ্বেগ দেড় বছরের ক্ষমতায় কতটুকু কাজে রূপান্তরিত হলো?
পলিথিন নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু বাজারে পলিথিন আগের মতোই আছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে পানির বোতলের বদলে জগ আনা হয়েছে, প্রতিজনের জন্য আলাদা জগ। খাল পরিষ্কারের উদ্বোধনে লাল গালিচা বিছানো হয়েছে। এই কাজগুলোর প্রতীকী মূল্য হয়তো আছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন কোথায়?
সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো জলবায়ু সম্মেলন প্রসঙ্গটা। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তার একটি। সেই সম্মেলনে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাঠানোর বদলে পাঠানো হয়েছে এমন মানুষদের, যাদের কাজের সাথে জলবায়ুর সম্পর্ক নেই কিন্তু রিজওয়ানার সংগঠনের সাথে সম্পর্ক আছে। নির্বাচিত কয়েকজন তরুণ ভিসা জটিলতায় আটকে গেছেন। এই ঘটনাটা একটা প্যাটার্ন দেখায়, যেখানে পরিবেশ রক্ষার কাজ আর নিজের নেটওয়ার্ক রক্ষার কাজ গুলিয়ে যায়।
রিজওয়ানা হাসান বহু বছর ধরে এই দেশে পরিবেশ আন্দোলনের একটি পরিচিত মুখ। সেই পরিচিতি তাকে সহানুভূতি এনে দিয়েছে, বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় বসে যখন মিথ্যা বলতে হয়, আর নিজের দায়িত্বের জায়গায় কাজ দেখাতে হয়, তখন সেই পুরনো পরিচিতি আর কাজে আসে না। মানুষ দেখে কী হয়েছে, কী হয়নি।
সাংবাদিকরা জেলে আছেন। পত্রিকায় আগুন লেগেছে। আর তথ্য উপদেষ্টা বলছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। এই তিনটি বাক্য একসাথে রাখলে আর বেশি কিছু বলার থাকে না।
আরো পড়ুন

