Share
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা মজার প্যাটার্ন আছে। বিরোধী দলে থাকলে সবাই সংস্কারের কথা বলে, সরকারি অপচয়ের বিরুদ্ধে গলা ফাটায়, জনগণের ট্যাক্সের টাকা বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। আর ক্ষমতায় আসার পর? সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কোথায় যায় সেটা খুঁজে পেতে বেশি দূর যেতে হয় না।
তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন মন্ত্রিসভা হবে ছোটো, সরকার হবে চর্বিমুক্ত, রাষ্ট্রের অপচয় কমবে। কথাগুলো শুনতে ভালো লেগেছিলো। কারণ মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে সমালোচনা হয়েছে, সেই একই যুক্তিতে তারেক নিজেকে বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। জনগণের একটা অংশ সেটা বিশ্বাসও করেছিলো।
এখন সংখ্যার দিকে তাকানো যাক
শেখ হাসিনার পাঁচটি মন্ত্রিসভার শপথের দিনের আকার ছিলো যথাক্রমে ২০, ৩২, ৪৯, ৪৭ আর সবশেষ ২০২৪ সালে মাত্র ৩৭। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, শেষের দিকে সংখ্যাটা কমছিলো, বাড়ছিলো না। ২০২৪ সালের ৩৭ জনের মন্ত্রিসভা ছিলো গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ছোটো।
আর তারেক রহমান? ক্ষমতায় এসেই শপথের দিন মন্ত্রিসভায় ৫০ জন। তার উপরে মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা আরো ১০ জন। মানে কার্যত ৬০ জন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করছেন মন্ত্রীর মর্যাদায়। এই সংখ্যাটা শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভাকেও ছাড়িয়ে গেছে প্রথম দিনেই।
যে মানুষটা বলেছিলেন মন্ত্রিসভা ছোটো করবেন, তার প্রথম মন্ত্রিসভাই সেই মানুষের সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভার চেয়ে বড়, যাকে তিনি সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসেছেন। এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিহাস আর কী হতে পারে?
কিন্তু আসল সমস্যাটা শুধু সংখ্যায় না। সমস্যাটা হলো এই দেশে সমালোচনা সবসময় একমুখী। গত কয়েক বছর ধরে একটা বিশেষ শ্রেণি, অনলাইনে যারা খুব সক্রিয়, তারা শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে তুলকালাম করেছেন। ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, টকশো, সর্বত্র একই রব। রাষ্ট্রের অপচয়, জনগণের টাকার অপব্যবহার, বিশাল মন্ত্রিসভার বোঝা। কিন্তু সেই একই মানুষগুলো এখন কোথায়? তারেক রহমানের ৬০ জনের কার্যকর মন্ত্রিসভা নিয়ে তাদের কণ্ঠ এখন আশ্চর্যরকম নীরব।
এই নীরবতাটা আসলে অনেক কিছু বলে দেয়। এটা প্রমাণ করে যে সমালোচনাটা কখনো নীতিগত ছিলো না। ছিলো দলগত। মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে তাদের আপত্তি ছিলো না, আপত্তি ছিলো কে সেই মন্ত্রিসভা চালাচ্ছেন তা নিয়ে। যদি সত্যিকারের নীতিগত অবস্থান হতো, তাহলে তারেক রহমানের বেলায়ও একই প্রশ্ন উঠতো। উঠছে না।
বিএনপির ইতিহাস এই বিষয়ে আরো পরিষ্কার। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া যখন ৬০ জনের মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, সেটা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভা। সেই সময় বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন ১৯৩ জন। প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন মন্ত্রী। দলের ভেতরে পদ বিতরণ করে ঐক্য ধরে রাখার এটা একটা পুরনো কৌশল, নতুন কিছু না। কিন্তু যে দল এই রেকর্ড গড়েছে, সেই দলের নেতা এসে মন্ত্রিসভা ছোটো করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, এবং প্রথম সুযোগেই সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলছেন, এটাকে কী বলা যায়?
রাজনৈতিক ভণিতা এর চেয়ে ভালো সংজ্ঞা আর হয় না
এই দেশে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমরা প্রতিশ্রুতি মনে রাখি না। নেতারা জানেন, যা বলেছেন তা করতে না পারলেও কেউ হিসাব চাইবে না। কারণ তাদের সমর্থকরা অন্ধ, আর বিরোধীরা নিজেদের দলের স্বার্থে সমালোচনা করে, সত্যের স্বার্থে না। ফলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ভোটের জন্য, পালন করার জন্য না।
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা সেই পুরনো গল্পেরই নতুন অধ্যায়। ছোটো মন্ত্রিসভার কথা বলে ক্ষমতায় এসে বড় মন্ত্রিসভা দেওয়া, আর সেই বড় মন্ত্রিসভার পাশাপাশি মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টার একটা নতুন স্তর তৈরি করা, এটা শুধু প্রতিশ্রুতি ভাঙা না, এটা একটা নতুন নজির স্থাপন। রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর দাবিদারের সংখ্যা বাড়ানোর নতুন উপায়।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো এই নিয়ে যারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হওয়ার কথা, সেই তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ এখন নীরব। কারণ তারা দলের চশমা খুলে তথ্যের দিকে তাকাতে শেখেনি। তারা শিখেছে কাকে ঘৃণা করতে হবে, কাকে ভালোবাসতে হবে। কিন্তু কার কথা আর কাজ মেলে আর কার মেলে না, সেই হিসাবটা তারা এখনো করতে পারছে না বা করতে চাইছে না। সংখ্যা মিথ্যা বলে না। রাজনীতিবিদরা বলেন।
আরো পড়ুন

