Monday, February 23, 2026

ইউনূসের বিদায়ী উপহার : বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মৃত্যুপরোয়ানা

Share

মুহাম্মদ ইউনূস যখন ক্ষমতায় বসেছিলেন, তখন অনেকেই বলেছিলেন এটা নতুন বাংলাদেশের সুচনা। সেই “নতুন বাংলাদেশ” এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি কারণ তিনি চলে যাওয়ার আগে একটা উপহার রেখে গেছেন, যে উপহারের মোড়ক খুললে ভেতরে পাওয়া যায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কঙ্কাল।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে বাণিজ্য চুক্তিটা সই হয়েছে, সেটা পড়লে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মনে হয় কেউ বোধহয় ইচ্ছাকৃতভাবেই লিখেছে এটা, এতটা একতরফা একটা দলিল অনিচ্ছায় তৈরি করা সম্ভব না। তিরিশটার কাছাকাছি ধারা, দুইশোর বেশি উপধারা, আর পুরো দলিলজুড়ে মাত্র একটাই সুর, বাংলাদেশ দেবে, মানবে, মাথা নত করবে।

চুক্তি সই হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। সেই সময়টার কথা একটু ভাবুন। একটা অনির্বাচিত সরকার, যার মাটিতে দাঁড়ানোর কোনো গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই, সে জাতির ভবিষ্যৎ বাঁধা দিয়ে যাচ্ছে বিদেশি শক্তির কাছে। এবং করছে এমন সময়ে যখন নতুন সরকার আসতে আর মাত্র তিনটা দিন বাকি। এই তাড়াহুড়াটা কিসের? দেরি হয়ে গেলে কি চুক্তিটা আর হতো না? নিশ্চয়ই না। কারণ এই চুক্তি করার ইচ্ছা যাদের ছিল, তারা জানত নির্বাচিত সরকার এসে গেলে এটা আর হবে না।

বাংলাদেশ বলেছিল চুক্তির বিষয়বস্তু গোপন, প্রকাশযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র পরদিন সকালে নিজেদের ওয়েবসাইটে পুরো দলিল তুলে দিয়েছে। এই একটি ঘটনাই বলে দেয় দুই পক্ষের সম্পর্কটা কেমন ছিল। একপক্ষ লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছিল, আরেকপক্ষ গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দিচ্ছিল।

চুক্তিতে আমেরিকার সাড়ে ছয় হাজারের বেশি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্তভাবে ঢুকবে। বাংলাদেশের পণ্য আমেরিকায় ঢুকবে দেড় হাজার, এবং শুল্ক কতটা হবে সেটা আমেরিকার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এই হলো চুক্তির কাঠামো। বাংলাদেশ দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমেরিকা ঢুকবে কি ঢুকবে না সেটা তাদের মর্জি।

শুধু তাই নয়, আমেরিকা থেকে আসা পণ্যের মান পরীক্ষা করার অধিকারটুকুও থাকবে না বাংলাদেশের হাতে। বিএসটিআই বলুক, ওষুধ প্রশাসন বলুক, খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বলুক, এদের কেউ আমেরিকার পণ্যের দিকে আঙুল তুলতে পারবে না। ধরুন আমেরিকা থেকে বীজ আসছে যা বাংলাদেশের মাটির সাথে মেলে না, কীটনাশক আসছে যা দরকারি পোকামাকড় মেরে ফেলে, খাদ্যপণ্যে রাসায়নিক আছে যা বাংলাদেশের মানদণ্ড পূরণ করে না, এসব নিয়ে টুঁ শব্দও করা যাবে না। কারণ চুক্তি বলছে, বলা যাবে না।

ডেটার প্রশ্নটা আরও ভয়াবহ। ডিজিটাল অর্থনীতিতে ডেটা এখন তেলের মতো। সেই ডেটা কোথায় থাকবে, কে নিয়ন্ত্রণ করবে, এই প্রশ্নটাই এখন সারা দুনিয়ায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের কেন্দ্রবিন্দু। ভারত ডেটা লোকালাইজেশন করে। ইউরোপ করে। চীন তো বহু আগে থেকেই করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন থেকে করতে পারবে না, কারণ চুক্তিতে সেটা নিষেধ। ফেসবুক, গুগল, আমাজন এখানে যা আয় করবে তার উপর ট্যাক্সও দেবে না। বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎটা কার্যত বন্ধক পড়ে গেল।

সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকা যা বলবে বাংলাদেশকে তা মানতে হবে। আমেরিকা যদি চীনের কোনো কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করে, বাংলাদেশকেও একই কাজ করতে হবে। পারমাণবিক প্রযুক্তি অন্য কোনো দেশ থেকে কেনা যাবে না। মানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষানীতি এখন থেকে ওয়াশিংটনের অনুমোদনসাপেক্ষ।

দেশীয় শিল্পকে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। আমেরিকার কোম্পানি যে সুবিধা পাবে, দেশীয় কোম্পানিকেও ঠিক সেই সুবিধা দিতে হবে, বেশি দেওয়া চলবে না। মানে লাল তীর বা স্কয়ার যদি আমেরিকার কর্পোরেশনের সাথে প্রতিযোগিতায় পড়ে মার খায়, সরকার তাদের পাশে দাঁড়াতে পারবে না। আর পরিবেশ দূষণ করলে আমেরিকার কোম্পানিকে শাস্তি দেওয়া নিষেধ।

তুলার গল্পটা শুনলে আরও বিস্ময় লাগে। সরকার প্রচার করেছে, আমেরিকার তুলা কিনলে গার্মেন্টস পণ্য শুল্কমুক্তভাবে যাবে। কিন্তু আসল কথা হলো শুধু সেই পোশাকই শুল্কমুক্ত হবে যেটা আমেরিকার তুলায় বানানো। বাংলাদেশ তার মোট পোশাকের মাত্র আঠারো থেকে বিশ শতাংশ আমেরিকায় পাঠায়। এই আঠারো শতাংশের জন্য কি সব তুলা আমেরিকা থেকে কেনা যাবে, যেখানে ভারতীয় বা আফ্রিকান তুলার চেয়ে দাম বেশি, আসতে সময় লাগে বেশি? এটা করলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, সস্তা পোশাকের বাজার হারাবে বাংলাদেশ, আর আমেরিকার তুলার উপর নির্ভরতা তৈরি হবে যেটা পরে দরকষাকষির অস্ত্র হয়ে যাবে ওদের হাতে।

চুক্তি ভাঙলে কে কি শাস্তি পাবে, সেই বিষয়টাও একপেশে। বাংলাদেশ চুক্তি না মানলে আমেরিকা সাথে সাথে শুল্ক বাড়াতে পারবে। কিন্তু আমেরিকা চুক্তি ভাঙলে বাংলাদেশ কোনো প্রতিকার পাবে না, কোনো নিরপেক্ষ সংস্থার কাছেও যেতে পারবে না। দুই পক্ষের চুক্তিতে শাস্তির বিধান একদিকে, এটা কোনো চুক্তি না, এটা আত্মসমর্পণের দলিল।

যিনি এই চুক্তি করেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস, তাকে নিয়ে অনেক মিথ তৈরি হয়েছিল। গরিবের বন্ধু, নোবেলজয়ী, সুশীল সমাজের প্রতীক। কিন্তু এই মিথের পেছনে যে মানুষটা ছিল, সে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় এলো, সেটা সুপরিকল্পিত। বিদেশি অর্থায়নে আন্দোলন, সামরিক সমর্থন, জঙ্গি সংগঠনের ছায়া, আর শেষে ক্যু করে একটা নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়া। এই ইতিহাস যখন মনে রাখা হয়, তখন এই চুক্তিটাকে কোনো নীতির ভুল বলে মনে হয় না। মনে হয় পরিকল্পনার অংশ।

ইউনূস কার হয়ে কাজ করেছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এই চুক্তিতেই লেখা আছে। বাংলাদেশের রাজস্ব হারাবে, দেশীয় শিল্প মার খাবে, সার্বভৌমত্ব বন্ধক পড়বে, কিন্তু আমেরিকান কর্পোরেশনগুলো লাভবান হবে। যিনি চুক্তি করলেন, তার স্বার্থ কার সাথে ছিল সেটা এর চেয়ে পরিষ্কার করে আর বলার দরকার নেই।

এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এই চুক্তির বোঝা এখন তাদের ঘাড়ে। বাণিজ্য সচিব বলছেন চিঠি দেওয়া হবে আমেরিকাকে, জানতে চাওয়া হবে পরিণতি কি হবে। কিন্তু চিঠি দিয়ে কি হবে? আমেরিকা তো চুক্তি করেছে, তারা চিঠির জবাবে সেটা ছেড়ে দেবে না। নতুন সরকারকে এই চুক্তি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে, অথবা এর ভেতরে থেকেই দেশের স্বার্থ রক্ষার অসম্ভব লড়াই করতে হবে।

ইউনূস চলে গেছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া এই দলিলটা থেকে গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক রকম ক্ষতি হয়েছে, অনেক রকম বিশ্বাসঘাতকতা দেখা গেছে। কিন্তু একটা নিরীহ মুখের আড়ালে এতটা পরিকল্পিতভাবে একটা দেশকে শেষ করে যাওয়ার নজির বোধহয় কম আছে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত