Monday, February 23, 2026

ভারতবিরোধী কার্ড, দিল্লির ভিসা আর চল্লিশ লাখের ক্রিপ্টো

Share

মঙ্গলবার সকাল এগারোটায় দিল্লির কনট প্লেসে একটা ভিসা সেন্টারে বসে ছিলেন মাহদী হাসান। পর্তুগালের ভিসা নিতে এসেছেন। চেহারায় কোনো চিন্তার ছাপ নেই, একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। অথচ এই সেই মাহদী হাসান, যিনি মাস কয়েক আগে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে ক্যামেরার সামনে বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন যে বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন, এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে মেরেছেন। সেই একই মানুষ এখন দিল্লিতে বসে ইউরোপের স্বপ্ন দেখছেন।

ভারতকে গালি দিয়ে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে ইউরোপ যাওয়ার এই পরিকল্পনায় একটা অদ্ভুত নির্লজ্জতা আছে।

সন্তোষ চৌধুরী একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তার মৃত্যু নিয়ে মাহদী হাসান যা বলেছেন সেটা শুধু একটা হুমকি না, এটা একটা প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। ক্যামেরার সামনে, থানার ভেতরে বসে। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়, সমর্থকরা রাস্তায় নামেন, চাপে মুক্তি দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এই মুক্তিকে অনেকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ভারত দেখেছে অন্যভাবে। একজন হিন্দু কর্মকর্তা হত্যার দাবি করা মানুষ মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এই তথ্যটা ভারতীয় গোয়েন্দাদের ফাইলে নথিভুক্ত হয়েছিল। দিল্লিতে পৌঁছামাত্র সেই ফাইল সক্রিয় হয়েছে।

কনট প্লেসে কেউ তাকে চিনে ভিডিও করে ছেড়ে দিল। এরপর থেকে অপরিচিত নম্বরের ফোন আসতে শুরু করল। ভারতীয়, বাংলাদেশি দুই তরফ থেকে। বেলা দুটোয় বাংলাদেশ থেকে কেউ জানাল যে তিনি চিহ্নিত। তারপর দিল্লি শহরে আশ্রয় খুঁজলেন, কেউ রাখল না। পাহাড়গঞ্জের হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরের কাছে সরে গেলেন। রাতেই হাতে এল ঢাকার টিকিট। বুধবার সকালে নিরাপত্তা চেকিংয়ের লাইনে লাগেজ কনভেয়র বেল্টে দিলেন, লাগেজ এগিয়ে গেল, আর তখনই কাঁধে হাত পড়ল। আধঘণ্টা জেরা। শান্তভাবে, কোনো গায়ের জোর ছাড়াই। বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া হলো, তুমি এখানে থাকতে পারবে না, এখান থেকে ইউরোপ যেতে পারবে না, ফিরে যাও।

এখন প্রশ্নটা আসে টাকার।

মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রনেতা। কোনো চাকরি নেই, ব্যবসা নেই, আয়ের কোনো পরিচিত উৎস নেই। অথচ সূত্র বলছে দিল্লিতে আসার সময় তার কাছে ক্রিপ্টো কারেন্সিতে চল্লিশ লাখ টাকারও বেশি ছিল। সাংবাদিক যখন এটা নিয়ে প্রশ্ন করলেন, তিনি বললেন গুজব। কিন্তু গুজব বললেই তদন্তের দায় শেষ হয়ে যায় না। একজন বেকার ছাত্রনেতার ক্রিপ্টো ওয়ালেটে চল্লিশ লাখ টাকা কোথা থেকে এল, কে দিল, কী বিনিময়ে দিল, এই প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতে হবে। এবং শুধু তাকে নয়, যারা এই অর্থের উৎস জানেন তাদেরকেও।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর সহিংসতায় সারা দেশে থানায় আগুন দেওয়া হয়েছে, পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে মারা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর মন্দিরে হামলা হয়েছে। মাহদী হাসান সেই পর্বের একটি চরিত্র। থানার ভেতরে বসে যিনি হত্যার গল্প বলেন, তিনি কয়েক মাস পরে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করছেন। এটা কাকতালীয় মনে হয় না।

দিল্লিতে ফেরত পাঠানোর পর মাহদী হাসান বললেন তিনি প্রচণ্ড হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়েছেন, জীবন ঝুঁকিতে ছিল। কিন্তু বিবিসি বাংলার দুটি আলাদা সূত্র, যারা পুরো অপারেশন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন, দুজনেই বললেন গায়ে হাত দেওয়া হয়নি। ভারত যা করেছে সেটা হলো তার নিজের আইনি ক্ষমতার ভেতরে থেকে একটা অপাঙক্তেয় ব্যক্তিকে বের করে দিয়েছে। এটাকে নির্যাতন বলে চালানোর চেষ্টা আসলে ভারতবিরোধী কার্ড খেলার আরেকটা দফা। একদিকে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করো, অন্যদিকে ভারতের ভিসা নিয়ে দিল্লিতে বসে ইউরোপের দরজায় কড়া নাড়ো। এই দ্বিচারিতা লুকানোর কোনো জায়গা নেই।

এই পুরো ঘটনা একটা জরুরি প্রশ্ন সামনে এনেছে। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কি সন্তোষ চৌধুরীর পরিবারকে ন্যায়বিচার দিতে পারবে। যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে হত্যার দাবি করেছেন, রাজনৈতিক চাপে মুক্তি পেয়েছেন, এবং দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেছেন, তার বিরুদ্ধে মামলা কোথায় আছে। বিচার কতদূর এগিয়েছে। এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে করা দরকার, কারণ মৃত মানুষের পরিবারের কাছে রাজনীতি কোনো সান্ত্বনা না।

এবার আসা যাক সেই প্রশ্নে যেটা অনেকের মনে ঘুরছে। বাংলাদেশের বাইরে গেলেই কি এই ধরনের অভিযুক্তরা নিরাপদ? মাহদীর দিল্লি অভিজ্ঞতা বলছে না। তবে এখানে একটা সতর্ক বিভাজন দরকার। কেউ শুধু আন্দোলনে ছিলেন মানেই তিনি সর্বত্র বিপদে পড়বেন, এটা বলা ঠিক হবে না। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, যেগুলোর ভিডিও প্রমাণ আছে, নাম আছে, সাক্ষী আছে, এবং যারা বিচার এড়াতে দেশ ছাড়ার পথ খুঁজছেন, তাদের জন্য মাহদীর ঘটনা একটা বাস্তব সতর্কবার্তা।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন থেকে এই পর্বের সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্তদের গতিবিধি আরও মনোযোগ দিয়ে দেখবে, এটা ধরে নেওয়া অস্বাভাবিক না। এবং ভারতের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের চুক্তিতে থাকা দেশগুলোতেও এই তথ্য পৌঁছায়। অর্থাৎ ভারত হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথ বন্ধ হলেই শেষ না, অন্য রাস্তাগুলোও আগের মতো নিরাপদ নাও থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার যন্ত্রটা ধীরে কাজ করে, কিন্তু কাজ করে। মাহদী হাসান সেটা দিল্লিতে টের পেয়েছেন। ক্যামেরার সামনে যা বলা হয়েছে, যা করা হয়েছে, সেটা ফাইলে থাকে। সীমান্ত পেরিয়েও সেই ফাইল পৌঁছায়। দেশ ছেড়ে গেলেই দায় মুছে যায় না, এই সহজ সত্যটা যত তাড়াতাড়ি বোঝা যাবে, ততই ভালো।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত