Monday, February 23, 2026

ট্রাম্পের চিঠি: অভিনন্দনের আবরণে শর্তের খসড়া?

Share

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–কে পাঠানো অভিনন্দন বার্তা নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য বলে ধরে নেওয়া কঠিন। ভাষা, সময় এবং প্রেক্ষাপট—এই তিনটি বিষয় একত্রে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি শুধু শুভেচ্ছা নয়; বরং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা, যেখানে প্রত্যাশা স্পষ্ট, চাপ সুপ্ত, আর স্বার্থ সুসংগঠিত।
নীচে বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাক—চিঠির ভাঁজে ভাঁজে কী সংকেত লুকিয়ে আছে।

১. নির্বাচনের বৈধতা: দ্রুত স্বীকৃতি, দ্রুত সুবিধা

চিঠির শুরুতেই “ঐতিহাসিক নির্বাচন” বলে অভিনন্দন—এটি কেবল সৌজন্য শব্দচয়ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সিলমোহর। যখন কোনো নির্বাচন নিয়ে দেশের ভেতরে বিতর্ক থাকে, তখন পরাশক্তির দ্রুত অভিনন্দন রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো: এই স্বীকৃতি কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ফল? নাকি কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার হিসাব?যদি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাজনৈতিক রক্ষাকবচে পরিণত হয়, তবে তার বিনিময়ে কূটনৈতিক দেনা-পাওনার হিসাবও শুরু হয়। ইতিহাস বলছে, পররাষ্ট্রনীতিতে “ফ্রি লাঞ্চ” বলে কিছু নেই।

২. রেসিপ্রোকাল ট্রেড: সমতা নাকি বাজার দখলের নকশা? চিঠিতে “রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট”–এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শুনতে সুন্দর—পারস্পরিক লাভের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা: যুক্তরাষ্ট্র একটি বহুগুণ বড় অর্থনীতি। বাংলাদেশ রপ্তানিনির্ভর, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতকেন্দ্রিক। কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প এখনও ভঙ্গুর। যদি বাংলাদেশ তার বাজার মার্কিন কৃষিপণ্য, দুগ্ধজাত দ্রব্য, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করে, তাহলে— স্থানীয় কৃষক ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন কৃষির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে কি? ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ট্যারিফ কমানোর চাপে টিকে থাকবে কি? আমদানি বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে না?

“আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বাণিজ্য দর্শন মূলত মার্কিন শ্রমিক ও উৎপাদকদের স্বার্থকেন্দ্রিক। সুতরাং পারস্পরিকতার ভাষা থাকলেও লক্ষ্য একমুখী সুবিধা নিশ্চিত করা।

৩. প্রতিরক্ষা চুক্তি: সহযোগিতা নাকি কৌশলগত বাঁধন? চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান। মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রসঙ্গ এবং নিয়মিত প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রত্যাশা স্পষ্ট বার্তা বহন করে।

সম্ভাব্য প্রভাব: বড় অঙ্কের প্রতিরক্ষা ব্যয়, যা অর্থনৈতিক চাপে থাকা দেশের জন্য বাড়তি বোঝা। সামরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি, যা ভবিষ্যৎ নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন উত্তেজনা।

“মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক” কৌশল মূলত চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার অংশ। বাংলাদেশ যদি স্পষ্টভাবে এই বলয়ে প্রবেশ করে, তবে তা চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।

৪. ভূরাজনীতি: বঙ্গোপসাগর কার প্রভাব বলয়ে? বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল—দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝি, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার। পরাশক্তির দৃষ্টিতে বাংলাদেশ— বাণিজ্যিক করিডর, নৌ-কৌশলগত পয়েন্ট, এবং উদীয়মান ভোক্তা বাজার।

প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশ কি নিজস্ব কৌশল নির্ধারণ করছে, নাকি বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার বোর্ডে অবস্থান নিচ্ছে? ভারসাম্য নীতিই ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্য—সবাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। এখন সেই নীতি টিকে থাকবে, নাকি নতুন বাস্তবতা সেটিকে প্রতিস্থাপন করবে?

৫. বৈধতার উৎস: জনগণ নাকি বিদেশি সমর্থন? রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হয় তখনই, যখন সরকারের শক্তি আসে জনগণের আস্থা থেকে। যদি কোনো সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তার দায়বদ্ধতার কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তরিত হয়।

এখানেই মূল উদ্বেগ: সরকার কি সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে বড় সিদ্ধান্ত নেবে? প্রতিরক্ষা বা বাণিজ্য চুক্তি কি জনসমক্ষে আলোচনা হবে? নাকি নীতিনির্ধারণ হবে নীরব কূটনৈতিক আলোচনায়? স্বচ্ছতা না থাকলে যেকোনো চুক্তিই সন্দেহের জন্ম দেয়—সেটি যতই লাভজনক হোক না কেন।

৬. ট্রাম্পের কূটনীতি: আবেগ নয়, লেনদেন— ডোনাল্ড ট্রাম্প আদর্শিক কূটনীতির চেয়ে লেনদেনভিত্তিক কূটনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট— বন্ধুত্ব মানে পারস্পরিক লাভ; সহযোগিতা মানে বাজার ও কৌশলগত সুবিধা। এই চিঠি সেই ধারারই প্রতিফলন। এটি আবেগের অভিনন্দন নয়; বরং প্রত্যাশার তালিকা।

সার্বিক বার্তা: সুযোগ নাকি ফাঁদ? এই চিঠিকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক বা সম্পূর্ণ ইতিবাচক—কোনোটাই বলা যাবে না। এটি একসঙ্গে সুযোগ এবং পরীক্ষা। সুযোগ, যদি— বাংলাদেশ দক্ষ দর-কষাকষির মাধ্যমে বাণিজ্যে প্রকৃত সুবিধা আদায় করে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগায়, এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

ফাঁদ, যদি— বাজার একতরফাভাবে উন্মুক্ত হয়, ব্যয়বহুল অস্ত্র কেনা অর্থনীতিকে চাপে ফেলে, এবং পররাষ্ট্রনীতি একমুখী নির্ভরশীলতায় আবদ্ধ হয়। সবশেষে প্রশ্নটি রয়ে যায়— বাংলাদেশ কি অংশীদার হবে, নাকি কেবল ক্রেতা? কৌশলগত সহযোগী হবে, নাকি দাবার গুটি?

ট্রাম্পের চিঠি সেই প্রশ্নের সূচনা মাত্র। উত্তর নির্ভর করবে তারেক রহমানের সরকারের সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার ওপর।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত