Share
গত ৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে। সমস্যা হলো এই সরকারের কোনো জনগণের ম্যান্ডেট নেই, কোনো নির্বাচনী বৈধতা নেই, এবং সাংবিধানিক অর্থে এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা সরকার মাত্র। অথচ তারা এমন একটি চুক্তিতে সই করে বসল যার ভার বহন করতে হবে আগামী দশকের বাংলাদেশকে, আগামী প্রজন্মকে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা উঠে আসে। কোন অধিকারে একটি অনির্বাচিত সরকার দেশের হয়ে এত বড় দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি দেয়? ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ক্রয়, ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার অঙ্গীকার, সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি, এগুলো কোনো ছোটখাটো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এগুলো জাতীয় অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। একটি নির্বাচিত সংসদ, একটি জবাবদিহিমূলক সরকার, একটি স্বচ্ছ আলোচনা প্রক্রিয়া ছাড়া এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতন্ত্রের চেতনার সাথে সরাসরি সংঘর্ষ।
তার উপর চুক্তিটি হয়েছে চরম তাড়াহুড়োয়, প্রায় লুকিয়ে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে। যেন ১২ ফেব্রুয়ারির পর আর সুযোগ থাকবে না, যেন নির্বাচিত সরকার এলে এই চুক্তি হবে না, তাই যতটুকু পারা যায় আগেই বেঁধে ফেলো। এই মানসিকতাটাই আসলে সবকিছু বলে দেয়। যে সিদ্ধান্ত সঠিক, যে চুক্তি দেশের স্বার্থে, সেটা নিয়ে লুকোচুরির দরকার পড়ে না।
আর এই তাড়াহুড়োর মাশুলও দিতে হলো দ্রুত। চুক্তির মাত্র ১১ দিনের মাথায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল যে ট্রাম্প প্রশাসনের পারস্পরিক শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তিটাই অবৈধ। মানে যে ভয় থেকে এত তাড়াতাড়ি চুক্তি করা হলো, সেই ভয়ের ভিত্তিটাই নড়বড়ে ছিল। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মাসের পর মাস ধরে এই আইনি প্রশ্নগুলো তুলছিলেন। সতর্কতার সংকেতগুলো দৃশ্যমান ছিল। ইউনুস সরকার সেগুলো দেখেও দেখেনি, অথবা দেখতে চায়নি।
তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা আর বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই আলোচনার মুখ্য চালক ছিলেন। একজন অনির্বাচিত ব্যক্তি, একটি অনির্বাচিত সরকারের হয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ বন্ধক দিয়ে এসেছেন। এর জন্য জাতির কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো জবাবদিহি নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো চুক্তির ভেতরে থাকা শুল্ক-বহির্ভূত ধারাগুলো। ডিজিটাল বাণিজ্য ও পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এই চুক্তি সংকুচিত করেছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কার সাথে কীভাবে সম্পর্ক রাখবে, সেটাও এখন আংশিকভাবে ওয়াশিংটনের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার যে নমনীয়তা একটি সার্বভৌম দেশের থাকার কথা, সেটাকে এই চুক্তি সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।
এই সরকার দেশ চালাতে এসেছিল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু দেশের মানুষ যখন জিজ্ঞেস করবে, কোন কর্তৃত্বে এই চুক্তি হলো, তখন উত্তর কী দেবে? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এত বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত যায় জনগণের কাছে। কিন্তু এই চুক্তিতে জনগণের মতামতের কোনো জায়গা ছিল না, সংসদের কোনো ভূমিকা ছিল না, স্বচ্ছ আলোচনার কোনো সুযোগ ছিল না।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার এখন এই জটিল উত্তরাধিকার পেয়েছে। চুক্তির শর্তগুলো পরিবর্তন করা সহজ নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার মতো অবস্থানে বাংলাদেশ নেই। আবার চোখ বন্ধ করে এগিয়ে গেলে দেশের অর্থনীতির উপর চাপ ক্রমশ বাড়বে। এই দুই সংকটের মাঝে পথ খুঁজতে হবে নির্বাচিত সরকারকে, একটি সমস্যার জন্য যেটা তারা তৈরি করেনি।
ইউনুস সরকারের এই পুরো পর্বটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় শিক্ষা। অনির্বাচিত সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি থেকে বিরত রাখার আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা কেন দরকার, এই চুক্তি তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তারা জনগণের ভাগ্য নির্ধারণের এই ক্ষমতা পায় কোথা থেকে, এই প্রশ্নটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন তাড়া করে বেড়াবে।
আরো পড়ুন

