Share
২৫ ফেব্রুয়ারি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবস। ৫৭ জন সেনা অফিসার সেদিন নিজেদের কর্মস্থলেই জীবন দিয়েছিলেন। এই শোকের দিনে, এই নিহতদের স্মরণ করতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির মুখ খুললেন এবং বললেন, এই ঘটনায় যতজন সেনা অফিসার মারা গেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও নাকি এতজন মারা যাননি।
একটু থামুন। কথাটা আবার পড়ুন। এই লোক বলছেন, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সামরিক বাহিনীর এতজন শহীদ হননি।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিট মিলিয়ে অন্তত দেড় হাজার সদস্য ৭১-এ শহীদ হয়েছেন। নৌ-কমান্ডো এবং নৌসদস্য শহীদ হয়েছেন তিনশোরও বেশি, অপারেশন জ্যাকপটের মতো অভিযানে জীবন দিয়ে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। বিমানবাহিনীর প্রায় একশো সদস্য শহীদ হয়েছেন। পুলিশ ও ইপিআর মিলিয়ে শহীদের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। শুধু ২৫ মার্চ রাতে, একটি মাত্র রাতে, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আড়াইশো থেকে তিনশো পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। অস্ত্র হাতে তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিলেন।
এই সংখ্যাগুলো জামায়াতে ইসলামীর আমিরের জানার কথা। তিনি জানেন। কিন্তু তারপরেও বললেন। এটা অজ্ঞতা নয়, এটা সুচিন্তিত মিথ্যা।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কথা মনে করুন। তিনি পাকিস্তানি বিমান ছিনিয়ে দেশের মাটিতে ফেরার চেষ্টা করতে গিয়ে মারা গেছেন। বাংলাদেশে তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত। পাকিস্তানে? পাকিস্তান সরকার ওই বিমানের পাকিস্তানি পাইলট রশিদ মিনহাসকে দিয়েছে ‘নিশান-ই-হায়দার’, দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান। আর মতিউর রহমানের ছবি দীর্ঘদিন ওই বিমানঘাঁটির গেটে টাঙানো ছিল। ছবির নিচে উর্দুতে লেখা ছিল একটাই শব্দ, গাদ্দার। বিশ্বাসঘাতক। পাকিস্তানের জাতীয় ইতিহাসে তিনি হাইজ্যাকার।
ঠিক একইভাবে, যারা ৭১-এ বাঙালিদের বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছে, মা-বোনদের ধরিয়ে দিয়েছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, সেই রাজাকার-আলবদরদের পাকিস্তান দেখে ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে। আলবদর বাহিনীর সদস্যদের জন্য পাকিস্তানে আলাদা পরিচয়পত্র ছিল, মাসিক ভাতা ছিল। পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া অনেক আলবদর সদস্য জামায়াতের পাকিস্তানি শাখার সহায়তায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, গবেষণা করেছেন। পাকিস্তানের পাঠ্যবইয়ে দশকের পর দশক ধরে এদের ‘বিদ্রোহ দমনকারী দেশপ্রেমিক’ বলে পড়ানো হয়েছে।
এখন বুঝুন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী।
এই দলটি সেই একই আদর্শিক পরিবারের সদস্য যারা মতিউর রহমানকে গাদ্দার বলে, যারা রাজাকারদের দেশপ্রেমিক বলে, যারা একাত্তরের গণহত্যার বয়ান পাল্টাতে চায়। তাদের কাছে একাত্তর সত্যিকার অর্থে একটা সমস্যা, কারণ একাত্তরের সত্য ইতিহাস তাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আর এই প্রশ্নের জবাব এড়াতে তারা যা করে এসেছে তা হলো, ইতিহাসটাকেই বিতর্কিত বানিয়ে ফেলা। শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় তৈরি করা, গণহত্যার মাত্রাকে ছোট করা, মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্রে কালিমা লেপা। এটা তাদের পুরনো কৌশল এবং এই কৌশল তারা এত বছর ধরে এত নির্লজ্জভাবে প্রয়োগ করে আসছে যে এখন তারা নিজেরাও বোধহয় ভুলে গেছেন কোথায় থামতে হয়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে যখন অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, সেটা আমরা দেখেছি। এই ফেব্রুয়ারিতে যা হয়েছে সেটাও আমরা দেখেছি। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বিশাল অংশ যে ভোটকে বয়কট করেছে, সেই অংশগ্রহণহীন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভাগ নেওয়ার যে চেষ্টা করা হয়েছে তাও আমরা দেখেছি।
যে সংগঠনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে, যার শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছে, সেই সংগঠনের আমির আজ জাতীয় শোকের দিনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করছেন। এটা শুধু একটা মিথ্যা বক্তব্য নয়, এটা একটা চিন্তাধারার প্রকাশ, যে চিন্তাধারা একাত্তরেও এই ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড অবশ্যই এই জাতির জন্য একটা গভীর ক্ষত। ৫৭ জন সেনা অফিসার এবং মোট ৭৪ জনের মৃত্যু অপূরণীয় এবং সেই ক্ষতিকে ছোট করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই ক্ষতিকে ব্যবহার করে একাত্তরকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করাটা কোন মানবিক উদ্দেশ্য থেকে আসে না। এটা আসে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে, সেই প্রয়োজনটা হলো একাত্তরের দায় থেকে বাঁচা।
৭১ বিতর্কের বিষয় নয়। লাখো মানুষের রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক আলোচনার পণ্য নয়। এই সত্যটা বদলানোর ক্ষমতা কারো নেই, তা সে যত বড় দলের নেতাই হোক না কেন।
আরো পড়ুন

