Share
জিয়াউর রহমান নিজে লিখে গেছেন। নিজের হাতে, নিজের ভাষায়। ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলায়, ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। “বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হল” এই কথা তিনি লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে তিনি জাতির পিতা বলেছেন, সেটাও তাঁর নিজের লেখায় আছে। কোনো আওয়ামী লীগ নেতা বলেননি, কোনো মুজিবভক্ত সাংবাদিক লেখেননি। স্বয়ং জিয়াউর রহমান লিখে রেখে গেছেন।
এরপরেও যারা বলেন শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি, তাদের সাথে তর্ক করা যায় না। কারণ এটা জ্ঞানের সমস্যা না, এটা নিয়তের সমস্যা।
বিএনপি গত কয়েক দশক ধরে যা করে আসছে সেটা তাদের প্রতিষ্ঠাতার প্রতি সবচেয়ে বড় অবিচার। জিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাতে গিয়ে তারা জিয়াকেই ক্রমশ ইতিহাসের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। ৭ মার্চকে অস্বীকার করতে গিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে সাজাতে গিয়ে, বঙ্গবন্ধুকে ছোট করতে গিয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে জিয়া নিজে যা বিশ্বাস করতেন, তাঁর দল সেটাকেও মানে না। জিয়াকে দিয়ে যারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাজনীতি করে, তারা আসলে জিয়াকেই অপমান করছে। কারণ জিয়া নিজেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে তাঁর যুদ্ধে নামার কারণ বলেছেন।
এই বিকৃতির সংস্কৃতি এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হলো। একটা দেশের জাতির পিতার স্মৃতিধন্য বাড়ি, যেখানে সপরিবারে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই বাড়িও রক্ষা পেল না। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে এটা সম্ভব হতো? উত্তর জানা আছে, তবুও প্রশ্নটা রেখে দিলাম।
আর এই পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ কী হলো সেটা দেশের মানুষ দেখেছে। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বাইরে, ভোটকেন্দ্রে মানুষ নেই, পাড়ায় পাড়ায় নিস্তব্ধতা, এবং সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে কিছু মানুষ নিজেদের মধ্যে নিজেরা একটা আয়োজন করে ক্ষমতার চেয়ারে বসে পড়লেন। এটাকে নির্বাচন বলা মানে নির্বাচন শব্দটাকে অপমান করা।
যে সরকার এভাবে এলো, তার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? জনগণের রায় তো নেই। গণতন্ত্রের বৈধতাও নেই। যা আছে তা হলো সেনানিবাসের ছায়া আর বিএনপির পুরনো রাজনৈতিক অভ্যাস, প্রতিপক্ষকে মাঠের বাইরে রেখে মাঠে নামো, তারপর বলো আমরাই একমাত্র বৈধ।
মজার বিষয় হলো, এই দলটি তার প্রতিষ্ঠাতার ইতিহাসকেই স্বীকার করে না। জিয়া ২৭ মার্চ যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটা ছিল বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দেওয়া ঘোষণা। এই সত্য বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর কারণ এটা স্বীকার করলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের মূল রাজনৈতিক আখ্যানটাই ভেঙে পড়ে। তাই তারা জিয়াকে নিজেদের সুবিধামতো ছাঁটাই করে নেয়। যেটুকু কাজে লাগে সেটুকু রাখো, বাকিটা চাপা দাও।
এই হলো আমাদের বিশেষত্ব। পৃথিবীতে আমরা সম্ভবত একমাত্র জাতি যারা ইতিহাস জানি, বুঝিও, তবু মানি না। মানতে চাই না, কারণ ইতিহাস মানলে রাজনৈতিক ব্যবসায় লোকসান হয়। তাই ইতিহাসকেই পালটে দাও, ভেঙে দাও, মুছে দাও।
কিন্তু জিয়ার নিজের হাতের লেখা তো পালটানো যাবে না। দৈনিক বাংলার পুরনো সংখ্যা কোথাও না কোথাও আছে। বিচিত্রার পাতা কোথাও না কোথাও টিকে আছে। ইতিহাস যতই অস্বস্তিকর হোক, সে তার জায়গায় থাকে। তাকে সরানো যায় না, শুধু চোখ বন্ধ করে নেওয়া যায়।
এই মুহূর্তে দেশে যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা চোখ বন্ধ রাখার রাজনীতি করছেন। এটা নতুন না, পুরনো অভ্যাস। কিন্তু মার্চ মাস এলে কিছু কথা বারবার সামনে আসে, কারণ এই মাসটার একটা নিজস্ব ভার আছে। এই মাসে মিথ্যাকে একটু বেশি কঠিন লাগে বহন করতে।
আরো পড়ুন

