Monday, March 9, 2026

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দেশে মব, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মহোৎসব, শঙ্কিত দেশবাসী

Share

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলার অভূতপূর্ব অবনতি ঘটেছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব হামলা ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা যেন এক অঘোষিত মহোৎসবে পরিণত হয়েছে।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এমনকি ভিক্ষুকের মতো অসহায় ব্যক্তিরাও রক্ষা পাচ্ছেন না। দেশবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম শঙ্কা, অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। পুলিশের তথ্য অনুসারে, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের হার ২৫-৩৫ শতাংশ বেড়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে গত ৭ মার্চ রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মো. মোতাহার হোসেন তারাবিহ নামাজের পর হাঁটতে বের হয়ে ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছুরির মুখে আটকে রেখে ছিনতাইকারীরা তার আইফোন (দুটি মডেল), ওয়ালেট (২০ হাজার টাকাসহ), দামি ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। হামলায় তার ঘাড় ও চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে ফোন উদ্ধার করে। এ ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—যদি দুদকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের অবস্থা কী? বরগুনার পাথরঘাটায় ভিক্ষা করার সময় এক বৃদ্ধা ভিক্ষুকের দুই কান ও নাকের স্বর্ণালংকার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তাঁর ডান কান থেকে টান দিয়ে দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় কানের নিচের অংশ ছিঁড়ে যায়। আজ সোমবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শহরের পাথরঘাটা সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে এ ঘটনা ঘটে।

চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। চট্টগ্রাম নগরীর চন্দনপুরায় শীর্ষ ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় মুহুর্মুহু গুলি চালানো হয়। পুলিশি পাহারা থাকা সত্ত্বেও মাস্ক পরা ৪ জন অস্ত্রধারী (এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগানসহ) বাড়ির দ্বিতীয় তলা লক্ষ্য করে গুলি করে। জানালার কাঁচ ভেঙে যায়, এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে বিএনপির ২৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও অস্ত্র মহড়ার অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের এক ইটভাটায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে শ্রমিকদের মারধর, কাজ বন্ধ করে দেওয়া ও মালিককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। গাইবান্ধার সাঘাটায় বোনারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মিয়াসহ তিনজনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এক কারখানায় চাঁদা না দেওয়ায় সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও মালামাল লুটের ঘটনা ঘটেছে।

ব হামলার ঘটনাও বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ মার্চ ভোর ৩টায় দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী রাহিদ খান পাভেলকে সেহরি খেতে যাওয়ার সময় জাতীয় ছাত্রশক্তির (বিএনপি-সংশ্লিষ্ট) সদস্যরা ছাত্রলীগের সদস্য সন্দেহে অপহরণ করে মারধর করে। বেল্ট, মোটরসাইকেল লক, ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। প্রায় ২-৩ ঘণ্টা মারধরের পর তাকে শাহবাগ থানার সামনে ফেলে রাখা হয়। এর আগে ৭ মার্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গতকাল শাহবাগ থানার সামনে আরেক দফা সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আসিফ আহমেদ সৈকত আটক হওয়ার প্রতিবাদে ইমি ও আব্দুল্লাহ আল মামুন রিকশায় মাইক বেঁধে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর কর্মসূচি পালন করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন।

জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী ও ডাকসুর সাবেক কিছু নেতার (এ বি জুবায়ের, মোসাদ্দেক ইবনে আলী) নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী ইমি ও মামুনকে টেনেহিঁচড়ে থানার ভেতরে ও ফটকে মারধর করে। পরে পুলিশ বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে এবং ৮ মার্চ তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে।

বর্তমানে পাভেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ইমি-মামুনসহ তিন ছাত্র কারাগারে রয়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো বা আদর্শিক ভিন্নতার কারণে যেভাবে শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ধ্বংস করছে। অন্যদিকে, অভিযোগ উঠছে যে নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ ক্যাম্পাসকে তাদের “আখড়ায়” পরিণত করে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর স্টিম রোলার চালাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়ে গেছে।

এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আইজিপি চাঁদাবাজি-ছিনতাই দমনে কঠোর নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি উল্টো। সরকার চাঁদাবাজি বন্ধের ঘোষণা দিলেও অপরাধীরা নির্ভয়ে চলছে। দেশবাসী প্রশ্ন করছেন—‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার শ্লোগানের আড়ালে কি পুরনো সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি ফিরে এসেছে?

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত