Sunday, November 30, 2025

ইউনূস-ম্যাজিকে বন্ধ হচ্ছে বাংলদেশিদের ভিসা, পাসপোর্ট দেখলেই করা হচ্ছে সন্দেহ

Share

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবুজ মলাটের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেরই যেন ‘অ্যালার্জি’। ভিসা দেওয়া তো দূরের কথা, যেসব দেশে ভিসা ‘অন-অ্যারাইভাল’ নিয়ম চালু আছে, সেসব দেশও বাংলাদেশিদের প্রবেশ করতে না দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

প্রেস সচিব শফিকুল আলম থেকে শুরু করে ইউনূসের বট বাহিনী তার কোনো কাজকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ম্যাজিক হিসেবে দেখান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু এখন আর এই ম্যাজিক কাজে আসছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ভারত নতুন করে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। বর্তমানে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই করে কেবল মেডিকেল ভিসা দেওয়া হলেও সামান্য ত্রুটি পেলেই অফলোড করা হচ্ছে।

সম্প্রতি দুবাই ও আবুধাবির মতো মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশও নতুন করে ভিসা প্রদান স্থগিত রেখেছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্টের ওপর যেন ভরসা পাচ্ছে না কেউই। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের ওপর জঙ্গিবাদের তকমা আরোপ করছে উন্নত দেশগুলো। এর ফলে দেশটির নাগরিকদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ৩ শতাধিক জঙ্গি জামিনে মুক্ত। এছাড়া কারাগার ভেঙে পালানো জঙ্গিরা এখনো রয়েছে অধরা। তাদের মধ্যে কেউ সন্দেহভাজন, কেউ বিচারাধীন, এমনকি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তও রয়েছেন। ধর্মের নামে অপপ্রচার, জঙ্গি সংগঠনের পুনরুত্থান এবং প্রশাসনের নীরব ভূমিকা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে নীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পাঁচই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর থেকে একের পর এক জঙ্গি মামলার আসামি জামিনে মুক্ত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিশৃঙ্খল মনোভাবের কারণে অনেক দেশের ধারণা, বাংলাদেশিরা তাদের দেশে অপকর্ম করতে পারে। এতে সে দেশের সুনাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলে সতর্ক থাকে।

আন্তর্জাতিক মহলের মতে, ভিসা প্রত্যাখানের পেছনে কয়েকটি বিষয় সরাসরি ভূমিকা রাখছে:- ১) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি। ২) সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি। ৩) উচ্চ যুব বেকারত্ব, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ৪২%। ৪) জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন প্রবণতা। এই ৪টি প্রধান কারণে উন্নত দেশগুলো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ভিসা নীতি কঠোর করছে।

পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ
২০২৪ সালে শেনজেন অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশিদের জমা পড়া ৩৯,৩৪৫ ভিসা আবেদনের মধ্যে ২০,৯৫৭টি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যা প্রায় ৫৪.৯%। ভিয়েতনাম, লাওস, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও মিশর, মালয়েশিয়া,ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কার্যক্রম বন্ধ বা কঠোর করেছে। ভারত এখন সীমিতভাবে চিকিৎসা ও শিক্ষা ভিসা দিচ্ছে।

ভিসা প্রত্যাখানের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশি ভ্রমণবিষয়ক ইউটিউবার নাদির নিবরাস জানান, বৈধ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার ভিসা থাকলেও তিনি তাজিকিস্তানের সাধারণ ই-ভিসা পাননি। আবেদন প্রত্যাখ্যানের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, এমনকি ফিও ফেরত দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে যাওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘ প্রস্তুতির পরেও মাত্র কয়েক মিনিটে তার ভিসা আবেদন বাতিল করা হয়। একই দিনে উপস্থিত আরও অন্তত ১০-১২ জন শিক্ষার্থীও ভিসা পাননি।

চীন থেকে পণ্য আমদানি করা এক ব্যবসায়ী জানান, গত তিন বছরে অন্তত ছয়বার চীন সফর করলেও এবার জুন মাসে তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে— ভিসা প্রত্যাখানের এই ধারা রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। বিদেশে পড়াশোনা করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়বেন, যা শিক্ষা খাতে প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

শ্রমবাজারে নতুন সিন্ডিকেট
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতটি বর্তমানে এক নতুন সিন্ডিকেটের চাপে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহচর লামিয়া মোর্শেদ, যিনি বর্তমানে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে রয়েছেন। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে একটি স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজন ব্যক্তি অধিষ্ঠিত হলেন, যার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।

গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস: একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার?
সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে ড. ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (GESL)। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালেই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল, যা তখনই বাতিল হয়। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ করেই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি।

এই অনুমোদনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিংয়ের অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে ড. ইউনূস ও লামিয়া মোর্শেদের প্রভাব ব্যবহারের প্রসঙ্গ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি জনশক্তি রপ্তানির নামে মূলত সিন্ডিকেট ব্যবসায় যুক্ত এবং দেশের অন্যান্য এজেন্সিগুলিকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বিএমইটির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সিন্ডিকেট রাজত্ব এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে বিগত এক বছরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

তিনি বলেন, “এখন শ্রমবাজারে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় লিপ্ত ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা। লামিয়া মোর্শেদকে সামনে রেখে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে যারা সরকারি সফরের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক জনশক্তি বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও নীতিগতভাবে ভয়াবহ। শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আস্থা হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। দেশের অন্যান্য বৈধ জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইসাথে সরকারি পদ ব্যবহার করে বেসরকারি স্বার্থ চরিতার্থ করার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

একজন বিশ্লেষক বলেন, “যদি এই সিন্ডিকেটিক নিয়ন্ত্রণ চলতেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জনশক্তি রপ্তানিতে স্বচ্ছতা থাকবে না। ইউনূসের প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বা সাহস কেউ দেখাতে পারবে না, কারণ রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তিনি একজন অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব খাটানোর প্রবণতা শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। এতে উদ্যোক্তারা যেমন আস্থা হারাচ্ছেন, তেমনি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত