মধ্যযুগীয় কুখ্যাত শরীয়াহ শাসন কায়েমের রূপরেখা ঘোষণা দিলো জামাত আমির আমেরিকায়

Share

নিউইয়র্কে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান যখন বলেন ক্ষমতায় গেলে নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেবেন, তখন আসলে একটা বিশাল বিপজ্জনক এজেন্ডার দরজা খুলে যায়। এই বক্তব্য শুধু একটা নীতিগত ঘোষণা নয়, এটা মূলত একটা সুচিন্তিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। যেই পরিকল্পনার শেষ গন্তব্য হলো নারীদের ঘরে বন্দী করা, তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, আর শেষমেশ পুরো দেশকে তালেবানি আফগানিস্তান কিংবা সিরিয়ার মতো একটা মধ্যযুগীয় জাহান্নামে পরিণত করা।

ভাবুন তো, কী অদ্ভুত যুক্তি! নারী আর পুরুষের কর্মঘণ্টা সমান হতে পারে না। কেন? কারণ তারা নারী? এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যখন বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী গার্মেন্টস থেকে শুরু করে ব্যাংক, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্পোরেট অফিস সব জায়গায় পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন, তখন এই ধরনের বক্তব্য শুধু পশ্চাদপদ নয়, এটা একেবারে বিপজ্জনক। এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটা সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

কর্মঘণ্টা কমানো মানেই মজুরি কমানো। আর মজুরি কমলে একজন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শেষ। যখন একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না, যখন তার হাতে টাকা থাকবে না, তখন তাকে নির্ভরশীল হতে হবে। আর সেই নির্ভরশীলতাই হচ্ছে জামায়াতের মতো দলগুলোর আসল লক্ষ্য। একজন স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল নারী তাদের চোখে ভয়ের। কারণ সে প্রশ্ন করতে পারে, সে রুখে দাঁড়াতে পারে, সে তাদের মধ্যযুগীয় ফতোয়া মানতে অস্বীকার করতে পারে।

জামায়াতের এই বক্তব্যের পেছনে আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার। প্রথমে কর্মঘণ্টা কমানো। তারপর বলা হবে, মেয়েদের এতটা পথ চলতে হয়, এত ভিড়ে কষ্ট হয়, তাই বাড়িতে থাকাই ভালো। তারপর বলা হবে, ইসলামে নারীদের বাইরে কাজ করার অনুমতি নেই, শরীয়াহ মানতে হবে। আর শেষমেশ নারীরা হয়ে যাবেন চার দেয়ালের বন্দী। ঠিক যেমনটা হয়েছিল তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল আইএসআইএস নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ায়।

বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি চলছে, সেটা আসলে একটা পরিকল্পিত ক্যুয়ের ফসল। জুলাইয়ের রক্তাক্ত ঘটনাগুলো শুধু কিছু বিক্ষিপ্ত দাঙ্গা ছিল না। এর পেছনে ছিল সুচিন্তিত পরিকল্পনা, বিদেশী অর্থায়ন, জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা আর কিছু শক্তিশালী মহলের নীরব সমর্থন। একটা নির্বাচিত সরকারকে জোর করে সরিয়ে, একটা অবৈধ ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। আর সেই ব্যবস্থার ছায়ায় এখন মাথা তুলছে জামায়াতের মতো দলগুলো।

মজার ব্যাপার হলো, ইউনূস সাহেব যিনি নিজে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন নারীদের ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার জন্য, তিনিই এখন হাত মিলিয়েছেন এমন শক্তির সাথে যারা নারীদের ঘরে বন্দী করতে চায়। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! একদিকে সুদের ব্যবসায় নারীদের জড়িয়ে কোটি কোটি টাকা কামানো, অন্যদিকে এমন দলের সাথে আঁতাত যারা নারীদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চায়। এই দ্বিচারিতা, এই ভণ্ডামি আসলে প্রমাণ করে যে তাদের কাছে নারী অধিকার, মানবাধিকার এসব শুধুই শ্লোগান, আসল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা আর নিয়ন্ত্রণ।

জামায়াতের ইতিহাস দেখলে সব পরিষ্কার হয়ে যায়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষে। তারা নির্যাতন করেছে, হত্যা করেছে, ধর্ষণে সহায়তা করেছে। সেই ইতিহাস ভোলার নয়। আর এখন তারা আবার চেষ্টা করছে বাংলাদেশকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে। তাদের লক্ষ্য একটাই: বাংলাদেশকে একটা ধর্মীয় মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে থাকবে না গণতন্ত্র, থাকবে না মুক্তবুদ্ধি, থাকবে না নারী-পুরুষের সমানাধিকার।

শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য আসলে একটা টেষ্ট কেস। তারা দেখতে চাচ্ছে মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। যদি এবারে কেউ প্রতিবাদ না করে, যদি সবাই চুপ থাকে, তাহলে পরেরবার তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। তারপর আরও এক ধাপ। এভাবে একদিন দেখা যাবে, বাংলাদেশের নারীরা হয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে বন্দী, তাদের পড়াশোনা, চাকরি, চলাফেরা সব কিছুতে লাগছে পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি। ঠিক যেমনটা আফগানিস্তানে হয়েছে।

বাংলাদেশের নারীরা আজ যে অবস্থানে আছেন, সেটা এসেছে অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে আজকের দিনের লাখ লাখ কর্মজীবী নারী, সবাই লড়াই করেছেন তাদের অধিকারের জন্য। আর এখন কিছু মৌলবাদী চক্র চাচ্ছে সেই সব অর্জনকে নষ্ট করে দিতে। এই দেশের গার্মেন্টস শিল্পের মেরুদণ্ড হলেন নারী শ্রমিকরা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন সব জায়গায় নারীরা অবদান রাখছেন। তাদের এই অবদান অস্বীকার করা, তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার নামে আসলে তাদের ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, এটা শুধু নারীদের প্রতি অবমাননা নয়, এটা পুরো দেশের উন্নয়নের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র।

জামায়াত আর তাদের মিত্ররা যে স্বপ্ন দেখছে, সেটা আসলে দুঃস্বপ্ন। তারা চাচ্ছে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সেই অন্ধকার যুগে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার ছিল না, যেখানে নারীরা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, যেখানে ধর্মের নামে চলত অত্যাচার আর নিপীড়ন। কিন্তু বাংলাদেশ সেই দেশ নয়। এই দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, প্রগতির জন্য সংগ্রাম করেছে।

শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য আসলে একটা সংকেত। সংকেত এই যে, জামায়াত আর তাদের মিত্ররা এখন আর লুকিয়ে নেই। তারা প্রকাশ্যে বলে দিচ্ছে তাদের এজেন্ডা কী। তারা আর মুখোশ পরে নেই। আর এই মুখোশহীন চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তাদের হাতে ক্ষমতা গেলে বাংলাদেশের কী হাল হবে। এই দেশকে তারা বানাতে চায় আরেকটা আফগানিস্তান, যেখানে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারবে না, কাজ করতে পারবে না, এমনকি পার্কে বেড়াতেও যেতে পারবে না। বাংলাদেশকে তারা বানাতে চায় সিরিয়ার মতো একটা ধ্বংসস্তূপ, যেখানে জঙ্গিবাদ আর মৌলবাদের দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ।

এই বিপদ শুধু নারীদের জন্য নয়, এই বিপদ পুরো দেশের জন্য। কারণ একটা দেশ তখনই এগিয়ে যায় যখন সেই দেশের সব মানুষ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, সমান সুযোগ পায়। যে দেশ তার অর্ধেক জনসংখ্যাকে পেছনে ফেলে রাখে, সে দেশ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। জামায়াত যে বাংলাদেশ চায়, সেখানে থাকবে না প্রগতি, থাকবে না উন্নয়ন, থাকবে শুধু অন্ধকার আর পশ্চাদপদতা।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত