Share
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর অক্টোবর মাসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেপ্টেম্বরে যেখানে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়েছিল ৫২টি, সেখানে অক্টোবর মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬-এ। একই সময়ে কারা হেফাজতে মৃত্যু ঘটেছে ১৩ জনের, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ইউনুস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশে প্রকাশ্যে হত্যা, মব হত্যাকাণ্ড, জঙ্গীবিরোধী অভিযান ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর টার্গেট হামলা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে সহিংসতা ও খুনোখুনি। আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে খুন হচ্ছেন, আবার অনেক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাকেও নিশানা বানানো হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো ভয় সৃষ্টি করে নির্বাচনী পরিবেশ অস্থির করে তোলা।
এমএসএফ জানায়, অক্টোবরে মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে ৬ জন ছিলেন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ৭ জন হাজতি বন্দি। এই মৃত্যুগুলো শুধু কারা ব্যবস্থার দুরবস্থাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ঘাটতিও প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক সহিংসতার ৩৮টি ঘটনায় আহত-নিহত হয়েছিল ২৯৬ জন, অথচ অক্টোবরে ৪৯টি ঘটনায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪৯ জনে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে এ ধরনের ৩৬৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ধর্ষণ ৭২টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ১৪টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা ৭টি। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন প্রতিবন্ধী নারী বা কিশোরী।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, “অজ্ঞাত লাশ ও হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিচ্ছবি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু লাশ উদ্ধার করেই দায়িত্ব শেষ করছে, কিন্তু পরিচয় শনাক্তকরণ, সুরতহাল, ময়নাতদন্ত এবং আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি অজ্ঞাত লাশ একটি পরিবারের অজানা কষ্টের প্রতীক। অথচ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় এসব মৃত্যুর সঠিক তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ার কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এটি নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এই পর্যায় যদি অব্যাহত থাকে, তবে শুধু মানবাধিকার নয়, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাও মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজের আহ্বান—রাষ্ট্রকে এখনই কঠোর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে। অন্যথায় অজ্ঞাত লাশ ও হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবতার জন্য এক অন্ধকার সংকেত হয়ে থাকবে।
আরো পড়ুন

