Share
রাজধানী ঢাকার জিগাতলা এলাকায় অবস্থিত একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন নারী হোস্টেল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন প্রভাবশালী নেত্রী জান্নাতারা রুমীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনা ঘিরে সবার মনে প্রথমেই উঠেছে একটি বড় প্রশ্ন: এটা কি সত্যিই আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো হত্যাকাণ্ডের ছায়া? ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার সকালে, এবং এরপর থেকেই চারদিকে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু পুরো বিষয়টি এখনও রহস্যাবৃত। পরিবারের পক্ষ থেকে হাজারীবাগ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রুমীর জীবন ছিল অত্যন্ত জটিল এবং দুর্ভাগ্যজনক। তার দুবার বিয়ে হয়েছে, কিন্তু দুটি সংসারই ভেঙে যায়। প্রথম বিয়ের পর তার একটি সন্তান হয়, এবং দ্বিতীয় বিয়ের পর আরেকটি। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই সম্পর্ক টিকেনি, ফলে সন্তানদের বাবাদের কাছেই রেখে দিতে হয়েছে। এই বিচ্ছেদ এবং সন্তানদের থেকে দূরে থাকার কারণে রুমী দীর্ঘদিন ধরে গভীর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, এই মানসিক চাপ তার জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল, এবং সম্ভবত এটাই তার এই দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ।
এদিকে, বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, রুমীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক এবং রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আবদুল হান্নান মাসুদের একটি অবৈধ সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক নিয়ে চারদিকে গুঞ্জন চলছে দীর্ঘদিন ধরে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করছে যে, কয়েক দিন আগে হান্নান মাসুদের বিয়ে হয়েছে, এবং এই খবর শোনার পর থেকে রুমী আরও বেশি হতাশায় ডুবে যান। তার মনে হয়তো এই সম্পর্কের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা তার মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তোলে। এছাড়া, সূত্র থেকে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে: রুমী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এই খবরটি যদি সত্য হয়, তাহলে তার মৃত্যুর পেছনে আরও জটিলতা যুক্ত হতে পারে। তবে এসব তথ্য এখনও নিশ্চিত করা হয়নি, এবং পুলিশের তদন্তে এগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
রুমীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আরও জানা যায় যে, তার বাড়ি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। তার বাবার নাম মো. জাকির হোসেন, যিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত। রুমী শিক্ষাজীবনে ধানমণ্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন, যেখানে তার পেশাগত দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক মাস ধরে তিনি বেকার ছিলেন, যা তার আর্থিক এবং মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি এনসিপির ধানমণ্ডি শাখার নারী নেত্রী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। কিছুদিন আগে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রাস্তায় একজন মায়ের বয়সী নারীকে হেনস্তা করার ঘটনায় তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি বিতর্কিত অধ্যায় যোগ করে। বৃহস্পতিবার সকালে হাজারীবাগ এলাকার ওই নারী হোস্টেল থেকে রুমীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হাজারীবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. কামরুজ্জামান জানান, সকালে খবর পেয়ে পুলিশ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে যে, রুমীর ঘরে তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল সিল করে দেয় এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ উদ্ধার করে। তিনি আরও বলেন, মৃতার বাবার নাম মো. জাকির হোসেন, এবং প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, জান্নাত আরা রুমী এনসিপির ধানমণ্ডি শাখার একজন সক্রিয় নারী নেত্রী ছিলেন। তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা মিলিয়ে এই ঘটনা আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
হাজারীবাগ থানার ওসি (অপারেশন) দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে বিস্তারিত তদন্ত চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে, যা এই রহস্যের অনেকটা উন্মোচন করতে পারে। এছাড়া, হোস্টেলের অন্যান্য বাসিন্দা এবং রুমীর পরিচিতদের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, যাতে কোনো সন্দেহজনক তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, তা দেখা যাবে।
এই ঘটনা না কেবল রুমীর পরিবারকে শোকাহত করেছে, বরং এনসিপির রাজনৈতিক মহলে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে যে গুঞ্জন এবং সন্দেহ উঠেছে, তা পুরো দলের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। সমাজে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্কের জটিলতা এবং রাজনৈতিক জীবনের চাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই রহস্যের পুরোটা উন্মোচিত হবে না, কিন্তু রুমীর জীবনের এই দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।
আরো পড়ুন

