Friday, January 30, 2026

রক্তই যেখানে পানি, রাজনীতি তখন সেখানে ব্যবসা

Share

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কৃতজ্ঞতা বলে একটা শব্দ আছে কিনা, সেটা নিয়ে সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক। বিএনপির ভেতরে এই মুহূর্তে যা ঘটছে, সেটা দেখলে মনে হয় রাজনীতি মানে শুধুই ক্ষমতা আর নিয়ন্ত্রণ, মানবিকতা বা পারিবারিক বন্ধন সেখানে কোনো বিবেচ্য বিষয়ই নয়।

আওয়ামী লীগ যখন টানা দেড় যুগ ক্ষমতায় ছিল, খালেদা জিয়া যখন জেলে, যখন অসুস্থ, যখন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে, তখন কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান দিনের পর দিন তার সেবা করে গেছেন। তারেক রহমান লন্ডনে বসে ভিডিও কনফারেন্সে দলের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন, আর শামিলা রহমান বাস্তবে মাটিতে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক সেবা থেকে শুরু করে পারিবারিক সব দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা কোনো গুজব নয়, দলের ভেতরের মানুষেরাই স্বীকার করেন এই কথা।

কিন্তু এখন যখন পরিস্থিতি পাল্টেছে, যখন ইউনুসের নেতৃত্বে একটা অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসেছে সামরিক সমর্থনে, যখন বিএনপি মনে করছে তাদের সময় এসে গেছে, তখন কোকোর পরিবারকে দলের রাজনীতি থেকে একেবারে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের চারপাশে যে নেতৃত্ব বলয় তৈরি হয়েছে, সেখানে কোকো পরিবারের কোনো জায়গাই নেই। কোনো কমিটিতে নেই, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেই, এমনকি প্রতীকী কোনো সম্মানজনক অবস্থানও নেই।

এটাকে কী বলবেন? রাজনৈতিক বাস্তবতা, নাকি পরিকল্পিত উপেক্ষা? যে পরিবার দুর্দিনে পাশে ছিল, তাদেরকে সুদিনে ভুলে যাওয়ার এই সংস্কৃতি আসলে বিএনপির নৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ।

আর এই যে ইউনুস সরকার, যেটাকে নিয়ে বিএনপি এখন এত আশাবাদী, সেই সরকার কীভাবে ক্ষমতায় এলো সেটা তো আমরা সবাই দেখেছি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে দাঙ্গা হলো, যে সহিংসতা হলো, যেভাবে একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে সরিয়ে দেওয়া হলো, সেটা কি গণতান্ত্রিক কোনো পদ্ধতি ছিল? বিদেশি অর্থায়ন, জঙ্গি সংগঠনের মদদ, সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থন, এসবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বসে থাকা একটা সরকার কোন মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে?

বিএনপি এই পুরো প্রক্রিয়ায় সহযোগী ছিল। তারা জানতো কী হতে যাচ্ছে, তারা চাইতো এই পরিবর্তন। এখন তারা মনে করছে ক্ষমতা তাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু নিজেদের পরিবারের একটা অংশকেই যখন তারা এভাবে উপেক্ষা করতে পারে, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য তাদের কাছ থেকে কী আশা করা যায়?

প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, এসব পত্রিকায় তারেক রহমানের খবর নিয়মিত ছাপা হয়। তার পরিবার নিয়ে ফিচার হয়, তার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বিশ্লেষণ হয়। কিন্তু কোকোর পরিবার? তারা যেন অস্তিত্বহীন। গণমাধ্যম ক্ষমতার কেন্দ্রকে অনুসরণ করে, এটা সত্য। কিন্তু এটাও তো সত্য যে বিএনপির ভেতরে কোকো পরিবারকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে।

এই যে ইউনুস, যিনি নিজেকে দরিদ্রদের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন, তিনি আসলে একজন সুদী মহাজন ছাড়া আর কিছু নন। গ্রামীণ ব্যাংক দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে যে সুদ আদায় করেছে, সেটা কোনো সাধারণ ব্যাংকের চেয়ে কম নয়। আর সেই মানুষটাই এখন দেশ চালাচ্ছেন অবৈধভাবে, সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায়। বিএনপি তার সহযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ তারা মনে করে এভাবেই তারা ক্ষমতায় ফিরতে পারবে।

কিন্তু যে দল নিজের পরিবারের প্রতিই ন্যায়বিচার করতে পারে না, যে দল দুর্দিনের সাথীকে সুদিনে ভুলে যায়, সেই দলের কাছ থেকে দেশের জন্য ন্যায়বিচার আশা করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। কোকোর পরিবারের এই নীরব বিলুপ্তি আসলে বিএনপির চরিত্রেরই একটা স্পষ্ট প্রতিফলন। ক্ষমতাই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য, সেখানে মানবিকতা, কৃতজ্ঞতা, নৈতিকতা এসবের কোনো মূল্য নেই।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত