Share
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ বহু পুরোনো। কিন্তু আলোচিত ঠিকাদার মোতাহেরুল ইসলাম মিঠুকে ঘিরে সাম্প্রতিক যে তথ্য ও অভিযোগ সামনে এসেছে, তা এই খাতে দুর্নীতিকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ রাখছে না। বরং এটি একটি সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে—যার কেন্দ্রে রয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের কারণে ‘মাফিয়া ঠিকাদার’ হিসেবে আলোচনায় আসেন মোতাহেরুল ইসলাম মিঠু। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তিনি সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদের ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। আইজিপি বেনজিরের পতনের পরপরই মিঠু দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে আত্মগোপনে যান—যা তখন অনেকটাই নিশ্চিত ছিল।
দুবাই থেকে ‘নিরাপদ প্রত্যাবর্তন’: কার নিশ্চয়তায়? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে এখানেই—পলাতক অবস্থায় থাকা, একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত একজন ঠিকাদার কীভাবে আবার দেশে ফিরলেন?
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের কয়েক মাস পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে “ভয়হীন নিশ্চয়তা” প্রদান করে মোতাহেরুল ইসলাম মিঠুকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। শুধু তাই নয়, দেশে ফিরে তাকে অবাধে চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হয়। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের এই আশ্রয় না থাকলে এমন প্রত্যাবর্তন সম্ভব হতো কি না—সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
২০০ কোটি টাকার বিনিময়ে আশ্রয়? এই প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি হলো—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদুর রহমান তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি ও অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিনিময়ে মোতাহেরুল ইসলাম মিঠুর কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা গ্রহণ করেছেন।
এখনো পর্যন্ত এই অভিযোগের কোনো স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়নি। তবে রাষ্ট্রের একজন শীর্ষ আমলাকে ঘিরে এমন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রশাসনের নৈতিক ভিত্তি ও জবাবদিহিতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আশ্রয়দাতা থেকে শত্রু: মনমালিন্যেই কারাগার?
ঘটনাপ্রবাহ এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মিঠুর সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে বদলি করা হলে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আর সেই মনমালিন্যের ফলেই হঠাৎ করে মোতাহেরুল ইসলাম মিঠুকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো এই গ্রেফতার কার্যক্রমটি সম্পন্ন করা হয় স্বাস্থ্য সচিবের ব্যাচমেট, জননিরাপত্তা সচিবের মাধ্যমে। যদি অভিযোগটি সত্য হয়, তবে এটি আইনের শাসনের নয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আইন ব্যবহারের একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত।
মাঠপর্যায়ে সিন্ডিকেটের ছায়া
এই প্রভাব শুধু সচিবালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। নীলফামারী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু আল হাজ্জাজের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ দাখিল হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ডা. হাজ্জাজ মোতাহেরুল ইসলাম মিঠুর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা। মিঠুকে ‘খুশি’ রাখতেই তাকে দীর্ঘ চার বছর ধরে একই পদে বহাল রাখা হয়েছে। ডা. হাজ্জাজ নিজেও প্রকাশ্যে দাবি করেছেন—তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই আসুক, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
তার রাজনৈতিক পরিচয়ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসক সংগঠনের নেতা ছিলেন রাজনৈতিক পদ পরিবর্তনের পর তিনি এখন বিএনপি ডাক্তার জাহিদ সমর্থক হয়ে উঠেছেন এই রাজনৈতিক সংযোগই কি তাকে কার্যত অদৃশ্য সুরক্ষা বলয় দিয়েছে?
আইনের শাসন না ক্ষমতার সমীকরণ? এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনে দেয়—স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি কি কয়েকজন ব্যক্তির সীমাবদ্ধ অপরাধ, নাকি এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লালিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা?
একজন ঠিকাদার বিদেশে পালিয়ে গিয়েও শীর্ষ আমলাদের আশ্রয়ে দেশে ফিরতে পারেন, আবার ব্যক্তিগত মনমালিন্যের কারণে রাতারাতি কারাগারে যেতে হয়—এটি কি আইনের শাসন, নাকি ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ?
স্বাস্থ্য খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে এসব অভিযোগ যদি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের আওতায় না আসে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু প্রশাসনের ভাবমূর্তি নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। এখন প্রশ্ন একটাই—২০০ কোটি টাকার বিনিময়ে ‘নিরাপদ প্রত্যাবর্তন’-এর এই গল্পের সত্য উদঘাটনে রাষ্ট্র কি আদৌ প্রস্তুত?
আরো পড়ুন

