Wednesday, February 4, 2026

বাস্তবতার বাইরে পথ নেই: ভারতবিরোধিতার রাজনীতি ও আত্মহননের প্রস্তুতি

Share

যারা মনে করছে ভারতকে এড়িয়ে বাংলাদেশ নিজের মতো করে চলতে পারবে, তারা আসলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূগোল আর ইতিহাস দুটোই উপেক্ষা করছে। এটা কোনো দলীয় মতাদর্শের প্রশ্ন নয়, এটা নিছক ভূরাজনৈতিক সত্য। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা সহিংসতা দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, তারা এই সত্য মানতে নারাজ। কারণ তাদের অস্তিত্বই নির্ভর করছে ভারতবিরোধিতার ন্যারেটিভের ওপর।

ইউনুস আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জামায়াত-বিএনপি জোট মনে করছে বিদেশি মদদে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে। কিন্তু ইতিহাস বলে অন্য কথা। পাকিস্তানও একসময় মনে করেছিল আমেরিকা আর চীনের সাহায্যে ভারতকে টেক্কা দেওয়া যাবে। আজ সেই পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিক দেউলিয়া, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায় একঘরে। তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল ভারতবিরোধিতা, আর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠামোটা আজ ভেঙে পড়ছে।

বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। জামায়াত-বিএনপির রাজনীতি সবসময়ই পাকিস্তানপন্থী ছিল, তাদের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আজও অস্বীকার্য এক ঘটনা। ইউনুসের মতো একজন ব্যক্তি, যার আসল পরিচয় সুদখোর মহাজন হিসেবে, তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতায় বসে আছেন কোনো নির্বাচনী বৈধতা ছাড়াই। তার পেছনে যারা আছে, তারা চায় বাংলাদেশকে একটা ধর্মভিত্তিক, পাকিস্তানমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভূগোল বদলায় না। বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত, এটা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন হওয়ার নয়।

ভারত এখন যে অবস্থানে আছে, সেটা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দশকের পর দশক ধরে কূটনৈতিক বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সংস্কার আর সামরিক আধুনিকীকরণের ফলে আজ ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি। চীন হয়তো জিডিপিতে এগিয়ে থাকবে, কিন্তু গণতান্ত্রিক বৈধতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আর সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে ভারতের অবস্থান চীনের চেয়ে অনেক শক্ত। যেখানে চীন ঋণের ফাঁদ দিয়ে দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেখানে ভারত সম্পর্ক তৈরি করে সহযোগিতা আর আস্থার ভিত্তিতে। এই পার্থক্যটাই আগামী দশকগুলোতে নির্ধারণ করবে কোন দেশ আসলে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। কিন্তু যারা এখন ক্ষমতায় আছে, তারা এই বাস্তবতা বুঝতে অক্ষম। জামায়াত-বিএনপির রাজনীতি সবসময়ই ছিল পরিচয়ের সংকট নিয়ে। তারা চায় বাংলাদেশকে একটা মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিতে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো জায়গা নেই। এই ন্যারেটিভ টিকিয়ে রাখতে হলে ভারতকে শত্রু বানানো ছাড়া উপায় নেই, কারণ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু এই রাজনীতির পরিণতি কী হবে? পাকিস্তান এর উত্তর দিয়ে গেছে। তারা সত্তর বছর ধরে ভারতবিরোধিতা করে নিজেদের ধ্বংস করেছে। আজ তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অকার্যকর, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কোনো মর্যাদা নেই। এখন বাংলাদেশ যদি একই পথ ধরে, তাহলে পরিণতি ভিন্ন হবে কেন?

শ্রীলঙ্কাও ভারসাম্য হারিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকেছিল। ফলাফল? দেউলিয়াত্ব আর রাজনৈতিক অস্থিরতা। তারা হাম্বানটোটা বন্দর চীনের কাছে বন্ধক দিয়ে বুঝেছে যে ঋণের ফাঁদ কতটা মারাত্মক। নেপাল আর মালদ্বীপও একাধিকবার এই ভুল করেছে, আর প্রতিবার তাদের ফিরে আসতে হয়েছে বাস্তবতার কাছে।

বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু যারা এখন ক্ষমতায় আছে, তারা শিখতে অক্ষম। কারণ তাদের পুরো রাজনৈতিক পরিচয়ই দাঁড়িয়ে আছে ভারতবিরোধিতার ওপর। ইউনুসের মতো একজন ব্যক্তি, যিনি গরিব মানুষের কাছ থেকে সুদ নিয়ে ধনী হয়েছেন, তিনি কখনোই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন না। তার উদ্দেশ্য নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, আর সেজন্য তিনি যেকোনো বিদেশি শক্তির সাথে হাত মিলাতে প্রস্তুত।

জামায়াত আর বিএনপির ইতিহাস তো আরও পরিষ্কার। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যা চালিয়েছে, আর বিএনপি হলো জিয়াউর রহমানের তৈরি একটা সামরিক প্রকল্প, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলা। এদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশকে আবার ১৯৭১ সালের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

যারা মনে করছে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে বাংলাদেশ কিছু পাবে, তারা বাস্তবতা দেখছে না। পাকিস্তান নিজেই একটা ভেঙে পড়া রাষ্ট্র, তাদের কাছ থেকে কী পাওয়ার আছে? আর ভারতের মতো একটা উদীয়মান পরাশক্তিকে শত্রু বানিয়ে লাভ কী? এটা আত্মহত্যার নামান্তর।

কিন্তু এই যুক্তি যাদের কাছে পৌঁছানো দরকার, তারা শুনতে রাজি নয়। কারণ তাদের মধ্যে অনেকেই ধর্মীয় আবেগে অন্ধ, আর ধর্মের নামে রাজনীতি করা জামায়াত-বিএনপির মূল হাতিয়ার। তারা মানুষকে বোঝায় যে ভারত হিন্দু রাষ্ট্র, তাই তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনা হয় স্বার্থের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হয়েও বাংলাদেশের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে, এই ইতিহাস তো মুছে যায়নি।

আর যারা জানে কিন্তু মানতে চায় না, তারা আসলে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এরা বুঝে যে বাংলাদেশের জন্য ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখাটা জরুরি, কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে তারা উল্টো কথা বলে। এরা জানে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়, কিন্তু নিজেদের ক্ষমতার লোভে তারা দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে রাজি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই বাস্তবতা অস্বীকারের সংস্কৃতি। মানুষ যা দেখতে চায়, তাই দেখে। যা শুনতে চায়, তাই শোনে। কিন্তু যা সত্য, তা মানতে চায় না। ফলে দেশ এগোয় না, বরং পেছনে যায়। পাকিস্তানের উদাহরণ সামনে থাকার পরও মানুষ একই ভুল করতে প্রস্তুত, কারণ তাদের মধ্যে শিক্ষার অভাব, চিন্তার অভাব, আর দূরদর্শিতার অভাব।

রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ দিয়ে হয় না, হয় বাস্তবতা দিয়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা সহিংসতা দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের কাছে বাস্তবতার কোনো মূল্য নেই। তারা চায় ক্ষমতা, যেকোনো মূল্যে। আর সেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা দেশকে যেকোনো বিপদের মুখে ঠেলে দিতে প্রস্তুত।

ইউনুস আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা মনে করছে বিদেশি মদদে তারা টিকে থাকবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিদেশি মদদ সাময়িক। যখন সেই মদদ শেষ হবে, তখন তাদের দাঁড়ানোর কোনো জায়গা থাকবে না। আর তখন বাংলাদেশকে ফিরতে হবে বাস্তবতার কাছে, কিন্তু ততদিনে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।

যারা মনে করছে ভারতকে এড়িয়ে চলা যাবে, তারা আসলে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে পাশ কাটিয়ে কেউ সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। এটা কোনো দলীয় বক্তব্য নয়, এটা ভূরাজনৈতিক সত্য। কিন্তু যাদের কাছে এই সত্য পৌঁছানো দরকার, তারা হয় বুঝতে অক্ষম, নয়তো মানতে অনিচ্ছুক।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এই ভুলের মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। যারা ক্ষমতার লড়াইয়ে মত্ত, তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে নেবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভুগবে অর্থনৈতিক মন্দায়, রাজনৈতিক অস্থিরতায়, আর আন্তর্জাতিক একাকিত্বে। বাংলাদেশ যদি মেক্সিকো বা ইউক্রেনের মতো অবস্থায় পড়ে, তাহলে তার দায় কার? যারা আজ ক্ষমতায় বসে আছেন, তাদেরই।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জন্য ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ নেই। এটা কোনো আওয়ামী লীগের কথা নয়, এটা ভূগোল আর ইতিহাসের কথা। কিন্তু যারা এখন ক্ষমতায় আছে, তারা এই সত্য মানতে নারাজ। তাদের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে ভারতবিরোধিতার ওপর, আর সেই ভিত্তি ছাড়লে তাদের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।

কিন্তু ইতিহাস অপেক্ষা করে না, ভূগোল ক্ষমা করে না। যারা আজ চোখ বন্ধ করে আছে, তারা কাল বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই। তখন আর কোনো স্লোগান কাজে আসবে না, কোনো আবেগ রক্ষা করবে না। থাকবে শুধু পরাজয়ের হিসাব, আর একটা ভেঙে পড়া দেশের ধ্বংসাবশেষ।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত