Share
শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের এপ্রিলে সংসদে যা বলেছিলেন, সেটা অনেকে হাসিয়া উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঠিক তাই ঘটল যা তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। প্রশ্ন হলো, আমেরিকা যদি সত্যিই এমন ক্ষমতা রাখে যে যে কোনো দেশে সরকার পাল্টে দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশের জনগণের ভোটাধিকার, সংবিধান, গণতন্ত্র এসবের মূল্য কী? আর যদি না রাখে, তাহলে বাংলাদেশে ঠিক কী হলো গত বছরের জুলাইয়ে?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী সরাসরি অপহরণ করে নিয়ে গেছে তার নিজের দেশ থেকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এটাকে “অসাধারণ সাফল্য” বলে অভিহিত করেছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সনদ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এসব বিষয় ওয়াশিংটনের কাছে নিতান্তই কাগজের টুকরো। তারা যা চায় তাই করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন পদ্ধতি বেছে নিয়েছে, যেটা আরও বিপদজনক। কারণ এখানে তারা ব্যবহার করছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারী জামায়াতে ইসলামীকে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই নতুন কৌশল পুরোনো সোভিয়েত বিরোধী মুজাহিদিন তৈরির প্রকল্পের চেয়েও ভয়াবহ। আফগানিস্তানে তারা তালেবান তৈরি করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। সিরিয়ায় আইএসআইএস এবং আল-নুসরা ফ্রন্টকে সমর্থন দিয়েছিল বাশার আল আসাদের সরকারকে হটানোর জন্য। লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে সরিয়ে পুরো দেশটাকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। আর এখন বাংলাদেশে তারা জামায়াতকে ব্যবহার করছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, জামায়াত শুধু মৌলবাদী সংগঠন নয়, এটা প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী সংগঠন যার হাতে লাখো বাঙালির রক্ত।
ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী মার্কিন কূটনীতিকরা মনে করছেন আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত “সবচেয়ে ভালো ফল” করবে। এই বক্তব্য কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ নয়। এটা হলো একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ইঙ্গিত। কূটনীতিকরা বিশ্লেষক নন যে তারা নির্বাচনী ফলাফল অনুমান করবেন। তারা যখন এমন কথা বলেন তখন বুঝতে হবে তারা সেই ফলাফল নিশ্চিত করার কাজে লিপ্ত আছেন। জামায়াতের নেতা সুলতান আহমেদ যখন বরগুনায় জনসভায় দাবি করেন যে “আমেরিকা জামায়াতের ওপর নির্ভর করেই অগ্রসর হচ্ছে”, তখন এটা নিছক গোঁজামিল নয়। এটা হলো মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতার প্রকাশ্য স্বীকৃতি।
কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এসে বলছেন যে “নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের”। এই ভণ্ডামি দেখে শুধু হাসি পায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন সশস্ত্র দাঙ্গার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো, তখন জনগণের অধিকারের কথা কই ছিল? যে অভ্যুত্থানে ৩০০ এর বেশি পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক হামলা হয়েছে, সেখানে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন ছিল না। ছিল পরিকল্পিত সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্যু।
ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলার মন্তব্য এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন “কারচুপি হলে জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারে”। তার এই বক্তব্যের অর্থ পরিষ্কার। জামায়াতের প্রকৃত জনসমর্থন ৫ থেকে ৭ শতাংশ, এমনকি সেটাও অন্য রাজনৈতিক দলের সহায়তায়। তাহলে কীভাবে তারা ক্ষমতায় আসবে? কারচুপির মাধ্যমে। আর সেই কারচুপির ব্যবস্থা করবে কারা? যারা এখন ক্ষমতায় বসে আছে অবৈধভাবে, অর্থাৎ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং তাদের মার্কিন প্রভুরা।
মুহাম্মদ ইউনুস কে? একজন সুদী মহাজন যিনি দরিদ্র মানুষকে ঋণের জালে আটকে রেখে সারাজীবন শোষণ করার একটা মডেল তৈরি করেছেন। মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচির নামে তিনি যা করেছেন তা হলো দারিদ্র্যকে পুঁজিতে রূপান্তরিত করেছেন। গরিব মানুষ আরও গরিব হয়েছে, আর ইউনুস নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ তাকে বীর বানিয়েছে কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন যে পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে থেকেই দারিদ্র্য সমাধান সম্ভব, সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে? বাংলাদেশে মাইক্রোক্রেডিট ঋণের বোঝা মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই ইউনুসকেই এখন তুলে এনে বসানো হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে। কোনো নির্বাচন নেই, কোনো জনগণের রায় নেই। শুধু সামরিক বাহিনীর সমর্থন আর মার্কিন আশীর্বাদ। এই সরকার এখন কী করছে? আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের নির্দেশে চলছে। ভর্তুকি তুলে দেওয়া হচ্ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা হচ্ছে। শ্রম আইন সংস্কারের নামে শ্রমিকদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এটা হলো নয়া উদারবাদী অর্থনীতির খোলামেলা প্রয়োগ।
কিন্তু এই অর্থনৈতিক শোষণই শেষ কথা নয়। আসল বিপদ হলো জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্বাসন। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সময় যে সহিংসতা হয়েছিল তার পেছনে জামায়াতের সশস্ত্র ক্যাডারদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। পুলিশ সদস্যদের হত্যা, হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে হামলা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এসব কাজ স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের অংশ ছিল না। এগুলো ছিল সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক সহিংসতা। ছাত্র আন্দোলনের নামে যে অভ্যুত্থান হয়েছিল তাতে জামায়াত এবং ছাত্র শিবিরের সংগঠিত অংশগ্রহণ ছিল মূল চালিকা শক্তি।
এই সহিংসতার অর্থায়ন কোথা থেকে এসেছে? সামাজিক মাধ্যমে যে বিশাল প্রচারণা চালানো হয়েছিল তার খরচ কে বহন করেছে? সারাদেশে একযোগে যেভাবে আক্রমণ সংগঠিত হয়েছিল তার পেছনে কোন কেন্দ্রীয় সমন্বয় ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বিদেশি অর্থায়নের জালে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন এনজিও এবং তথাকথিত গণতন্ত্র সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে গত দশ বছরে। এই অর্থের একটা বড় অংশ গেছে এমন সংগঠনগুলোর কাছে যারা সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে কাজ করে। ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (NED) এবং ইউএসএআইডির মতো সংস্থাগুলো এই কাজে সক্রিয়।
NED হলো সিআইএ’র একটা বেসামরিক সংস্করণ। এটা প্রকাশ্যে যেসব কাজ করে সিআইএ সেগুলো করে গোপনে। রোনাল্ড রেগানের আমলে এই সংস্থা তৈরি করা হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার মিত্র দেশগুলোতে “গণতান্ত্রিক আন্দোলন” তৈরি করার জন্য। পূর্ব ইউরোপে যেসব রঙিন বিপ্লব হয়েছিল, লাতিন আমেরিকায় যেসব সরকার পতন ঘটেছিল তার পেছনে এই সংস্থার হাত ছিল। বাংলাদেশেও তারা একই কাজ করছে। তারা অর্থ দেয় মিডিয়া আউটলেটগুলোকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে, যুব সংগঠনগুলোকে। শর্ত একটাই, সরকারবিরোধী অবস্থান নিতে হবে।
সামরিক বাহিনীর ভূমিকাও এখানে পরিষ্কার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সহায়তা পেয়ে আসছে। প্রতিবছর বাংলাদেশি সামরিক অফিসাররা যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিতে যান। এই প্রশিক্ষণ শুধু সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নয়। এটা হলো রাজনৈতিক আদর্শায়নেরও একটা প্রক্রিয়া। লাতিন আমেরিকায় “স্কুল অব দ্য আমেরিকাস” নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল যেখানে সামরিক অভ্যুত্থান কীভাবে সংগঠিত করতে হয়, বামপন্থীদের কীভাবে নির্মূল করতে হয় এসব শেখানো হতো। সেখান থেকে প্রশিক্ষিত অফিসাররা ফিরে গিয়ে নিজ নিজ দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যেও এই ধরনের প্রভাব তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ের ঘটনায় সেনাবাহিনী যেভাবে নিরপেক্ষতার অবস্থান নিয়েছিল, আসলে সেটা নিরপেক্ষতা ছিল না। সেটা ছিল নির্বাচিত সরকারকে রক্ষা না করার একটা সচেতন সিদ্ধান্ত। আর অভ্যুত্থানের পরপরই যেভাবে মুহাম্মদ ইউনুসকে ক্ষমতায় বসানো হলো, তাতে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এখন সেনাবাহিনীই হলো আসল ক্ষমতা, ইউনুস শুধু একটা বেসামরিক মুখোশ।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। শেখ হাসিনার সরকার চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে অংশ নিয়েছিল। পদ্মা সেতু, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র সহ বড় প্রকল্পগুলোয় চীনের বিনিয়োগ নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটা সহ্য করতে পারেনি। তারা চেয়েছিল বাংলাদেশ তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে অংশ নিক। চীনের বিরুদ্ধে সামরিক জোট কোয়াডে যুক্ত হোক। শেখ হাসিনা তা করেননি। ফলাফল, তাকে সরাতে হয়েছে।
কিন্তু শুধু সরালেই তো হবে না। তারপর কাকে বসাবে? আওয়ামী লীগের জায়গায় যদি বিএনপি আসে তাহলেও সমস্যা। কারণ বিএনপিও এখন পুরোপুরি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেই। তারেক রহমান লন্ডনে বসে আছেন। তিনি ব্রিটিশ প্রভাব এলাকায়। তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তাহলে সমাধান কী? জামায়াত। কারণ জামায়াত পুরোপুরি আদর্শিকভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সংগতিপূর্ণ। ইসলামি মৌলবাদ এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বন্ধুত্ব পুরোনো। সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক এসব দেশে এই মডেল কাজ করেছে। বাংলাদেশেও করবে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। জামায়াত কি আদৌ জনপ্রিয় দল? তাদের কি জনসমর্থন আছে? উত্তর হলো না। বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াত কখনোই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১৯৯১ সালে তারা পেয়েছিল ১৮টা সিট। ২০০১ সালে পেয়েছিল ১৭টা সিট, সেটাও চার দলীয় জোটের অংশ হিসেবে। ২০০৮ সালে পেয়েছিল মাত্র ২টা সিট। অর্থাৎ স্বাধীনভাবে তাদের কোনো জনসমর্থন নেই। কিন্তু এখন তারা দাবি করছে তারা ক্ষমতায় আসবে। কীভাবে? প্রথমত, ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, অন্য দলগুলোকে নির্বাচন থেকে দূরে রেখে। তৃতীয়ত, সহিংসতা এবং ভয়ভীতির মাধ্যমে ভোটারদের দমিয়ে রেখে।
আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে প্রায় ধ্বংস করা হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে রাখা হচ্ছে একটা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, কিন্তু তারাও জামায়াতের সাথে জোট করতে বাধ্য হবে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল হবে এরকম যে হয় জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসবে অথবা সরাসরি জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। এবং এই দুটো ক্ষেত্রেই আসল ক্ষমতা থাকবে জামায়াতের হাতে কারণ তাদের পেছনে আছে মার্কিন সমর্থন এবং সামরিক বাহিনীর একাংশ।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে কী হবে? প্রথমত, একাত্তরের ইতিহাস বদলানো হবে। মুক্তিযুদ্ধকে “ভারতীয় ষড়যন্ত্র” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বীর হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে তার শুরু হয়ে গেছে। কাদের মোল্লা, নিজামী, মুজাহিদ এদের পরিবারগুলো এখন প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়ন শুরু হবে। তৃতীয়ত, নারীর অধিকার খর্ব করা হবে। চতুর্থত, ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হবে। পঞ্চমত, শরিয়া আইন বাস্তবায়নের দিকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কিন্তু এসবের চেয়েও বড় বিপদ হলো বাংলাদেশ পরিণত হবে একটা জঙ্গি রাষ্ট্রে। জামায়াতের সাথে জঙ্গিবাদের সম্পর্ক পুরোনো। জেএমবি, হুজি, আনসারুল্লাহ ব্যাংলা টিম এসব সংগঠন জামায়াতের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যখন জামায়াত সরকারে ছিল তখন সারাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ২০০৫ সালে একযোগে ৫০০ স্থানে বোমা হামলা হয়েছিল। এখন যদি তারা ক্ষমতায় আসে তাহলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র জঙ্গিদের হাতে চলে যাবে। বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তান।
আর এটাই চায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। কেন? কারণ জঙ্গিবাদ এবং অস্থিতিশীলতা তাদের কৌশলগত স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ। একটা স্থিতিশীল, উন্নয়নশীল বাংলাদেশ চীনের মিত্র হতে পারে। কিন্তু একটা অস্থিতিশীল, জঙ্গিবাদে আক্রান্ত বাংলাদেশ সবসময় মার্কিন সামরিক সহায়তার মুখাপেক্ষী থাকবে। এবং সেই অজুহাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা যাবে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করা যাবে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে রাডার বসানো যাবে। পুরো বঙ্গোপসাগর নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
এই পরিকল্পনা শুধু বাংলাদেশের জন্যই বিপর্যয়কর নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলো নতুন প্রাণ পাবে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হবে। পুরো অঞ্চল জুড়ে জঙ্গিবাদের নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি হবে। চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ঘেরাটোপ শক্তিশালী হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ পরিণত হবে এই ভূরাজনৈতিক খেলার জিম্মিতে।
বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির জন্য এর অর্থ হবে দ্বিগুণ শোষণ। একদিকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির নামে মজুরি হ্রাস, কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার খর্বকরণ। অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদের নামে সংগঠিত হওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া। গার্মেন্টস শ্রমিকরা যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাদের জীবন হবে আরও দুর্বিষহ। এখনই তারা পায় না ন্যায্য মজুরি। কাজ করতে হয় অমানবিক পরিবেশে। আর তার উপর যোগ হবে ধর্মীয় বিধিনিষেধের নামে নতুন শৃঙ্খল।
কৃষক সমাজও রেহাই পাবে না। জমির মালিকানা এমনিতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বীজ, সার, কীটনাশক সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এর সাথে যোগ হবে ভূমি দখলের নতুন তরঙ্গ। জামায়াত এবং তাদের সহযোগীরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন সংখ্যালঘুদের জমি দখলের উৎসব চলেছিল। এখন সেটা হবে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ।
নারীদের অবস্থা হবে সবচেয়ে ভয়াবহ। বাংলাদেশ যে সামান্য যতটুকু নারী অধিকার অর্জন করেছে গত কয়েক দশকে, তার সব উল্টে যাবে। পোশাক নিয়ন্ত্রণ, চলাফেরায় বিধিনিষেধ, শিক্ষায় বাধা, কর্মক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা সব ফিরে আসবে। তালেবান আফগানিস্তানে নারীদের যা করেছে তার একটা সংস্করণ বাংলাদেশেও দেখা যাবে।
বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক যারা প্রগতিশীল চিন্তা করেন তাদের জন্য থাকবে না কোনো নিরাপত্তা। ইতোমধ্যে তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে যেসব মানুষ প্রগতিশীল মতামত দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এটা শুরু মাত্র। জামায়াত ক্ষমতায় এলে সাংস্কৃতিক শুদ্ধিকরণ অভিযান শুরু হবে। পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস এসব উদযাপন নিষিদ্ধ করা হবে। রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা বন্ধ হবে। বাংলা সিনেমা, গান, নাটক সব নিয়ন্ত্রণে আসবে শরিয়া বোর্ডের অধীনে।
শিক্ষাব্যবস্থায় আসবে মৌলবাদী পরিবর্তন। পাঠ্যক্রম থেকে মুছে ফেলা হবে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা। ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিষিদ্ধ হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হবে। ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা সম্প্রসারণ করা হবে। ফলাফল হবে একটা অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রজন্ম যারা যুক্তিবাদী চিন্তা করতে অক্ষম।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিণত হবে ধর্মীয় পুলিশে। পাকিস্তানের মতো হেফাজতে ইসলাম টাইপের সংগঠনগুলো পাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। তারা টহল দেবে রাস্তায়, নজরদারি করবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে। নামাজে না গেলে শাস্তি, দাড়ি না রাখলে শাস্তি, পর্দা না করলে শাস্তি এসব হবে আইনের অংশ।
বিচার ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইসলামি আইনের নামে প্রচলিত আইনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে। ব্লাসফেমি আইন করা হবে যার অজুহাতে যে কাউকে ফাঁসানো যাবে। মৌলবাদীরা ফতোয়া দেবে, আর রাষ্ট্র তা কার্যকর করবে। পাথর ছুঁড়ে হত্যা, হাত কেটে ফেলা এসব মধ্যযুগীয় শাস্তি ফিরে আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতেও বাংলাদেশ হবে বিচ্ছিন্ন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক খারাপ হবে। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান কেউই বিশ্বাস করবে না একটা জঙ্গি রাষ্ট্রকে। অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো যদিও মানবাধিকারের কথা বলে, কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থে তারা জামায়াত সরকারের সাথেও কাজ করবে। তবে সাধারণ মানুষের জীবন হবে দুর্বিষহ।
রেমিট্যান্সেও প্রভাব পড়বে। লাখ লাখ বাংলাদেশি যারা বিদেশে কাজ করেন তারা অনেকেই ফিরে আসতে চাইবেন না এমন একটা দেশে যেখানে মৌলবাদী শাসন। আবার অনেক দেশ হয়তো বাংলাদেশি শ্রমিক নিতে অনিচ্ছুক হবে জঙ্গিবাদের ভয়ে। ফলে অর্থনীতির একটা বড় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পর্যটন শিল্প ধ্বংস হবে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন এসব জায়গায় পর্যটক আসা বন্ধ হবে। কারণ কে যেতে চাইবে এমন দেশে যেখানে জঙ্গি হামলার ঝুঁকি? ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান হামলার পর যেমন পর্যটন শিল্প ধসে পড়েছিল, তার চেয়েও খারাপ হবে।
প্রযুক্তি খাতেও মন্দা দেখা দেবে। যেসব তরুণ উদ্যোক্তা স্টার্টআপ তৈরি করছিলেন, সফটওয়্যার ডেভেলপ করছিলেন, তারা দেশ ছেড়ে চলে যাবেন। কারণ মৌলবাদী পরিবেশে প্রযুক্তিখাত বিকশিত হতে পারে না। ইন্টারনেট সেন্সরশিপ বাড়বে। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতির যে সম্ভাবনা ছিল তা নষ্ট হবে।
স্বাস্থ্যখাতও ভুগবে। জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো বাধাগ্রস্ত হবে। পোলিও টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এসব নিয়ে মৌলবাদীদের আপত্তি আছে। পাকিস্তানে তালেবান পোলিও কর্মীদের হত্যা করেছে। বাংলাদেশেও তেমন ঘটনা ঘটতে পারে। মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হার আবার বাড়বে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে পারবে না প্রত্যন্ত এলাকায়।
পরিবেশ ধ্বংসও ত্বরান্বিত হবে। কারণ মৌলবাদী এবং নয়া উদারবাদী দুই ধরনের শক্তিই পরিবেশ সচেতন নয়। সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাহাড় কেটে পর্যটন সুবিধা, নদী দূষণ সব অব্যাহত থাকবে বরং বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ যেমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত, তার উপর এই দায়িত্বহীন নীতি আরও বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটা একটা মডেল হয়ে উঠবে। যেমন চিলিতে পিনোশের অভ্যুত্থান ছিল একটা মডেল যা পরে অন্য লাতিন আমেরিকান দেশগুলোতে প্রয়োগ করা হয়েছিল। তেমনি বাংলাদেশে যদি এই সাম্রাজ্যবাদ এবং মৌলবাদের জোট সফল হয়, তাহলে একই মডেল প্রয়োগ হবে পাকিস্তানে, ইন্দোনেশিয়ায়, মালয়েশিয়ায়। সারা মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ব্যবহার করবে ইসলামি মৌলবাদকে তাদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে।
আর এটাই হলো সবচেয়ে বড় পরিহাস। যে আমেরিকা ৯/১১ এর পরে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” ঘোষণা করেছিল, যে আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল তালেবানকে উৎখাত করার জন্য, ইরাক ধ্বংস করেছিল “গণবিধ্বংসী অস্ত্র” খোঁজার নামে, সেই আমেরিকাই এখন বাংলাদেশে জামায়াতকে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করছে। এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কী হতে পারে? এটা প্রমাণ করে যে সন্ত্রাস বা মৌলবাদ তাদের আসল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো যে কোনো স্বাধীনচেতা সরকার যারা তাদের নিয়ন্ত্রণ মানতে চায় না।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটা দেশের সংকট নয়। এটা সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার সংকট। সাম্রাজ্যবাদ এবং মৌলবাদের এই যুগপৎ আক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দরকার আন্তর্জাতিক সংহতি। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশে যা ঘটছে তা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। আজ বাংলাদেশ, কাল শিকার হতে পারে তারাও।
আরো পড়ুন

