Friday, February 6, 2026

কর্মজীবী নারীদের বেশ্যা বলার মধ্য দিয়ে জামাত আমির যে মানসিকতার পরিচয় দিলেন

Share

জামাতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি কর্মজীবী নারীদের নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই দেশে হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত আমির শাহ আহমদ শফি যখন বলেছিলেন মেয়েরা চাকরি করলে জেনার কারবার শুরু হয়, তখনও তো একই দৃশ্য দেখেছি। তখনও একদল মানুষ তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তার খ্যাতি বেড়েছিল। কিছু মডারেট মুসলমান অবশ্য তাকে কাঠমোল্লা, অশিক্ষিত বলে দায়সারা ভাবে সমালোচনা করেছিল। কিন্তু এবার তো আর সেই অজুহাত খাটে না। জামাতের আমির উচ্চশিক্ষিত, ডাক্তার। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা হলো এই চিন্তাধারার গভীরে, যা শিক্ষায় পরিবর্তন হয় না, বরং ক্ষমতার সাথে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন সারাদেশে দাঙ্গা বাধানো হলো, যখন বিদেশী অর্থায়নে, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলা হলো, তখন থেকেই এই পরিণতির আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার সহযোগী যুদ্ধাপরাধী ও জামাতে ইসলাম যখন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করল, তখন থেকেই বোঝা গিয়েছিল যে এদেশের নারীদের অধিকার, স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সবকিছুই এখন হুমকির মুখে। আর এখন সেই হুমকি স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে জামাত আমিরের মুখ থেকে।

যে দেশে লাখ লাখ নারী শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, সাংবাদিক, আইনজীবী, উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন, সেই দেশে তাদের বেশ্যা বলার সাহস কোথা থেকে আসে? এই সাহস আসে সেই মানসিকতা থেকে যা নারীকে শুধুমাত্র ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী দেখতে চায়। যে মানসিকতা নারীর স্বাধীনতাকে ভয় পায়, তার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে হুমকি মনে করে। কারণ স্বাধীন নারী প্রশ্ন করে, মাথা নত করে না, নিজের মতামত রাখে। আর এটাই তো এইসব মৌলবাদী শক্তির সবচেয়ে বড় ভয়।

এখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অফিসে যে হিজাবী বা নন-হিজাবী নারী সহকর্মী রয়েছে, তাকে যদি জামাত আমিরের এই বক্তব্য নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে অবাক হতে হবে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে। অনেকেই হয়তো এই বক্তব্যকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করবে, অথবা বলবে উনি হয়তো ঠিক এভাবে বলতে চাননি। এটাই হলো সবচেয়ে বড় মানসিক বৈকল্য। নিজেরা চাকরি করছে, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করছে, অথচ যিনি তাদের অস্তিত্বকেই অসম্মান করছেন, তার পক্ষে সাফাই গাইছে। এই যে আত্মবিরোধ, এই যে মানসিক দাসত্ব, এটাই হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

জামাতে ইসলাম এবং এর মতো ইসলামিক দলগুলো এই দেশের জন্য ক্যান্সারস্বরূপ। এরা শুধু নারীদের অধিকারের বিরুদ্ধে নয়, এরা মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। এদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ক্ষমতা দখল এবং সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ফিরিয়ে নেওয়া। ১৯৭১ সালে এরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে অংশ নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর এরা নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এখন বিদেশী অর্থায়ন এবং সামরিক সমর্থনে এরা আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে।

মুহাম্মদ ইউনুস, যাকে সুদী মহাজন বলা হয় কারণ তার মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচি দরিদ্র মানুষদের আরও গভীর ঋণের জালে আটকে ফেলেছে, তিনি এখন এই জামাতের সাথে হাত মিলিয়ে দেশ চালাচ্ছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দাঙ্গা ছিল একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বিদেশী রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। এখন সেই অবৈধ শক্তি দেশকে তাদের মতাদর্শের ছাঁচে ঢালাই করার চেষ্টা করছে।

জামাত আমিরের এই বক্তব্যের পক্ষে যে বিশাল জনমত দাঁড়াবে, সেটা অবশ্যই সত্য। কারণ এই দেশে একটা বড় অংশের মানুষ এখনও মনে করে নারীদের ঘরে থাকাই উত্তম। কর্মজীবী নারীদের মধ্যেও এমন অনেকে আছেন যারা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। এটা শুধু শিক্ষার অভাব নয়, এটা একটা গভীর মানসিক দাসত্ব, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। শিবিরের যে কয়জন বেপর্দা মেয়ে ডাকসুতে আছে, শিক্ষক হিসেবে আছে, তারা সবাই মডার্ণ চালচলনে চলাফেরা করে, কিন্তু তারাই আবার তাদের আমিরের এই বক্তব্যকে রক্ষা করতে গল্প বানাবে। এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিরোধ।

যে কোনো সভ্য দেশে জামাত আমিরের এই ধরনের বক্তব্যের পর তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত। কিন্তু বাংলাদেশ এখন একটা মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচয় দিতে চাইছে, যেখানে ধর্মের নামে যেকোনো অমানবিক বক্তব্যকে জায়েজ করা যায়। এখানে নারীবাদীরা রাস্তায় নামবে না, কারণ ডিপস্টেটের ডলার খেকো নারীবাদী যেমন আছে, তেমনি ইসলামিক নারীবাদী নামেও একটা জিনিস আছে, যারা ধর্মের নামে নারী নিপীড়নকে বৈধতা দেয়। এরা জামাত আমিরের বক্তব্যকে প্রসঙ্গ থেকে আলাদা করে দেখাবে, বলবে ইসলামে নারীদের অনেক মর্যাদা আছে, কিন্তু ঘরের বাইরে কাজ করার বিষয়টা জটিল।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে বাংলাদেশের মানুষ মানসিক বৈকল্যের শিকার। যারা এই মুহূর্তে অফিস করছেন, তারা যদি তাদের হিজাবী বা নন-হিজাবী কলিগকে জিজ্ঞেস করেন জামাত আমিরের বক্তব্য নিয়ে, তাহলে নিশ্চিতভাবে দেখা যাবে যে অনেকেই এই বক্তব্যকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে। এটা একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি। নিজেরা চাকরি করে, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করে, অথচ যিনি তাদের অস্তিত্বকে অসম্মান করছেন, তার পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। এটাই হলো মানসিক দাসত্বের চূড়ান্ত রূপ।

জামাতে ইসলাম এবং তাদের মিত্রদের উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি অন্ধকার অধ্যায়। এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। কিন্তু এখন সেই চেতনাকে পদদলিত করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ক্যু এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলী স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই দেশের গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, নারী স্বাধীনতা সবকিছুই এখন হুমকির মুখে। জামাত আমিরের এই বক্তব্য শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ যা নারীদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে চায়, তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়।

বাংলাদেশের ইসলামিক দলগুলো ক্যান্সারস্বরূপ কারণ এরা সমাজের সুস্থ কোষগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এরা শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে, সংস্কৃতিতে বিষ ছড়ায়, রাজনীতিতে সহিংসতা আনে, এবং ধর্মের নামে সমস্ত মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেয়। মুহাম্মদ ইউনুসের মতো সুদী মহাজন এবং তার সহযোগী যুদ্ধাপরাধীরা এখন এদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশকে আরও গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবৈধ ক্ষমতা দখলের পরিণতি ভয়াবহ হবে, কারণ এরা এখন নিজেদের মতাদর্শকে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ক্ষমতা ব্যবহার করছে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত