Friday, February 6, 2026

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি, দাম ১৫০ কোটি ডলার

Share

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে চুক্তিটা ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার দোসররা যতই শুল্কমুক্ত সুবিধার বুলি আওড়াক না কেন, সংখ্যাগুলো একটা ভয়াবহ বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। বাংলাদেশ বছরে অতিরিক্ত ১৫০ কোটি ডলার আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলেছে। এই টাকাটা কোথা থেকে আসবে? দেশের রিজার্ভ তো এমনিতেই তলানিতে ঠেকেছে, ডলার সংকট প্রতিদিন তীব্র হচ্ছে, আর এর মধ্যে আরও ১৫০ কোটি ডলার খরচ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এই অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশকে বছরে কমপক্ষে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স বা বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে। কিন্তু এটা আসবে কোথা থেকে? ইউনুস সরকার কি জাদুর কাঠি ঘুরিয়ে রাতারাতি বাংলাদেশের রপ্তানি দ্বিগুণ করে ফেলবে? নাকি রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য প্রবাসীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে? বাস্তবতা হলো, এই অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রায় ৭৫০ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী।

এবার দেখা যাক কী কী কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কেনা হবে, যার দাম পড়বে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বিমান বাহিনী বা বেসামরিক বিমান সংস্থাগুলোর এই মুহূর্তে এত বিমানের প্রয়োজন আছে কিনা। নাকি এটা শুধুমাত্র আমেরিকান কোম্পানিকে খুশি করার জন্য করা হচ্ছে? দেশের মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের চাপে জর্জরিত, যখন ডলার সংকটের কারণে আমদানি সীমিত করতে হচ্ছে, তখন ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিমান কেনার যৌক্তিকতা কোথায়?

গম আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন আসে। চুক্তিতে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ প্রতি বছর সাত লাখ টন গম কিনবে আমেরিকা থেকে, এবং সেটা কিছুটা বাড়তি দামে। এর মানে হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে গম যদি সস্তাও পাওয়া যায়, বাংলাদেশ তবুও বেশি দাম দিয়ে আমেরিকা থেকে কিনতে বাধ্য থাকবে পাঁচ বছর ধরে। এটা কি দেশের স্বার্থে, নাকি আমেরিকার কৃষক আর কোম্পানিগুলোর স্বার্থে? যখন দেশের সাধারণ মানুষ চালের দাম নিয়ে হাহাকার করছে, তখন বাড়তি দামে গম কিনে জনগণের ওপর সেই বোঝা চাপানো হবে।

সামরিক পণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিটা আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ কি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যে তাকে হঠাৎ করে আমেরিকা থেকে অস্ত্র কিনতে হবে? নাকি এটা আমেরিকার সামরিক শিল্পকে ব্যবসা দেওয়ার একটা উপায়? এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেকে আমেরিকার সামরিক নির্ভরশীলতার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল আর তুলা আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কথা বলা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মানে হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশ চুক্তিতে বাঁধা দামেই কিনতে বাধ্য থাকবে। এটা ব্যবসায়িক দিক থেকে চরম বোকামি, যদি না এর পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে।

এই পুরো চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে? আমেরিকান তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা। কিন্তু এই সুবিধা আদতে কতটা লাভজনক? বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বর্তমানে যে তুলা ব্যবহার হয়, তার বেশিরভাগই আসে ভারত, চীন আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যেখানে দাম তুলনামূলকভাবে কম। আমেরিকান তুলা কিনলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, এবং সেই বাড়তি খরচ কি শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে? আর শুল্ক যদি ২০ শতাংশ থেকে কমিয়েও ১০ বা ১৫ শতাংশ করা হয়, তাহলে সেই সুবিধাটুকুও খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়।

মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। এটা কি কাকতালীয়, নাকি পরিকল্পিত? ইউনুস সরকার যেভাবে আমেরিকার প্রতিটি ইঙ্গিতে সাড়া দিচ্ছে, তাতে মনে হয় এই চুক্তিটা আসলে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণপত্র। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে দাঙ্গা হয়েছিল, যার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গিদের সংগঠিত সহিংসতা এবং সেনাবাহিনীর একাংশের মদদ ছিল বলে নানা প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেই দাঙ্গার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ইউনুস ক্ষমতায় এসেছেন। এখন সেই ঋণ শোধ করার পালা।

আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। এই ঘাটতি কমানোর কথা বলে আসলে আরও ১৫০ কোটি ডলার আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেবে যদি না রপ্তানি একই হারে বাড়ানো যায়। কিন্তু রপ্তানি বাড়ানোর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি এই চুক্তিতে নেই। আছে শুধু আশাবাদ যে তুলা থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়বে। এটা হলো একটা অসম চুক্তির নমুনা, যেখানে একপক্ষ নিশ্চিত সুবিধা পাচ্ছে আর অন্যপক্ষ শুধু আশায় বুক বাঁধছে।

বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুল্কহার কত হবে তা ঘোষণা করা হবে। মানে এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত নয় যে শুল্ক কমিয়ে কত করা হবে। এই ধরনের গোপনীয়তা কেন? জনগণের টাকা খরচ করে যে চুক্তি হচ্ছে, তার শর্তাবলী জনগণের জানার অধিকার নেই? এই গোপনীয়তাই প্রমাণ করে যে এই চুক্তিতে এমন কিছু আছে যা প্রকাশ করলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হবে।

দেশের রিজার্ভ যখন সংকটে, যখন টাকার দাম দিন দিন পড়ে যাচ্ছে, যখন আমদানি সীমিত করে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমানোর চেষ্টা চলছে, ঠিক সেই সময়ে ১৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচের প্রতিশ্রুতি দেওয়া মানে দেশের অর্থনীতির সাথে খেলা করা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেরাই বলছেন যে এই চাপ সামলাতে বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় দরকার। সেই ব্যবস্থা না করেই চুক্তি করে ফেলা হচ্ছে। এটা হলো দায়িত্বহীনতার চরম নমুনা।

শ্রম ও মানদণ্ড ইস্যুতে নজরদারি বাড়বে বলেও জানানো হয়েছে। এর মানে হলো, আমেরিকা বাংলাদেশের শ্রমনীতি, শ্রমিকদের অধিকার, এমনকি কারখানার পরিবেশ নিয়েও নাক গলানোর অধিকার পাবে। এটা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। একটা স্বাধীন দেশে অন্য কোনো দেশের এই ধরনের নজরদারির অধিকার কীভাবে দেওয়া যায়?

ইউনুস সরকার দাবি করছে যে এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই আমেরিকার অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই প্রবেশাধিকার ইতিমধ্যেই আছে। নতুন করে এত বড় মূল্য দিয়ে কী পাওয়া হলো?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই চুক্তির শর্তগুলো কে নির্ধারণ করেছে? নির্বাচিত কোনো সরকার নয়, জনগণের ম্যান্ডেট নেই যে সরকারের, সেই সরকার দেশের জন্য এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। একটা অবৈধ সরকার, যে সরকার ক্যু করে ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকারের কি এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার নৈতিক বা আইনগত অধিকার আছে?

বাংলাদেশকে আমেরিকার অর্থনৈতিক করদরাজ্যে পরিণত করার এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে জুলাইয়ের সেই সুপরিকল্পিত দাঙ্গা দিয়ে। নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে এমন একজনকে বসানো হয়েছে যিনি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রিয়পাত্র। এবং এখন সেই আনুগত্যের বিনিময় দেওয়া হচ্ছে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে। ১৫০ কোটি ডলার আমদানির প্রতিশ্রুতি, ৫০ হাজার কোটি টাকার বিমান কেনা, বাড়তি দামে গম আমদানি, সামরিক পণ্য কেনা, এগুলো সবই সেই বিনিময়ের অংশ।

দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে, রিজার্ভ শূন্য করে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে, জনগণের ওপর আরও বোঝা চাপিয়ে যে সরকার বিদেশি প্রভুদের খুশি করতে চায়, সেই সরকারকে দেশের সরকার বলা যায় না। এটা হলো একটা দালাল সরকার, যে সরকার দেশকে বিক্রি করে দিচ্ছে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত