Share
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে “জুলাই আন্দোলন” একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, প্রাণহানি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই হঠাৎ প্রকাশিত হয় একটি তথাকথিত “জাতিসংঘ রিপোর্ট”—যেখানে দাবি করা হয়, এই আন্দোলনে ১৪০০ জন নিহত হয়েছেন এবং রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অপরাধে জড়িত। প্রকাশের পর মুহূর্তেই রিপোর্টটি দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে।
কিন্তু পরবর্তীকালে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চমকপ্রদ সত্য—রিপোর্টটি আদৌ জাতিসংঘের ছিল না। এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দলিল, যার সঙ্গে জাতিসংঘের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, রেজলিউশন বা বাজেট বরাদ্দের সম্পর্কই ছিল না।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (OHCHR) প্রধান ভলকার তুর্ক নিজ উদ্যোগে এই “ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট” প্রকাশ করেন এবং মিডিয়ায় সেটিকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল রিপোর্ট হিসেবে প্রচার করেন। অথচ জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো রিপোর্ট প্রকাশের আগে হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের অনুমোদন ও বাজেট প্রয়োজন হয়, যা এই ক্ষেত্রে হয়নি। তাছাড়া রিপোর্টটির কোনো “UN Document Number” পর্যন্ত ছিল না—যা জাতিসংঘের সব অফিসিয়াল নথির একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।
এখানেই শেষ নয়। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সেই বিতর্কিত রিপোর্টে সহযোগিতা করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বহু সূত্র দাবি করে, এটি আসলে ভলকার তুর্ক ও ইউনূসের যৌথভাবে প্রযোজিত একটি দলিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যে ব্যবহার করা হয়।
রিপোর্টে মৃত্যু সংখ্যা ও তথ্য বিকৃত করে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ছিল ৬৫০ থেকে ৮৩৪ জনের মধ্যে, অথচ ওই রিপোর্টে তা বাড়িয়ে ১৪০০ দেখানো হয়। আরও অবাক করা বিষয়, পরে দেখা যায়, রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত কিছু “মৃত ব্যক্তি” পরবর্তীতে জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন—যা প্রমাণ করে তথ্যের ভয়াবহ গরমিল ও অবিশ্বাস্যতা।
জাতিসংঘের মহাসচিব পরবর্তীতে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, এই রিপোর্ট তাদের অনুমোদিত নয়, কোনো রেজলিউশন বা আলোচনাতেও তা উপস্থাপিত হয়নি। তিনি আরও বলেন, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের বাইরে কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি দলিলকে জাতিসংঘের নামে চালানো বিভ্রান্তিকর ও অনৈতিক।
এই ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—এটি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সরাসরি একটি প্রতারণা। জাতিসংঘের মতো মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতিরও গুরুতর লঙ্ঘন। এমন কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জনআস্থা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে বিপন্ন করে তোলে।
বাংলাদেশের মানুষ আজ প্রশ্ন করছে—কে বা কারা এই “ভৌতিক রিপোর্ট”-এর পেছনে অর্থ ও প্রভাব জুগিয়েছিল? কী উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের নাম ভাঙিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হলো? এই প্রহসনমূলক প্রচারণা অবিলম্বে তদন্ত করা উচিত। জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে অনুরোধ—এই ভুয়া রিপোর্টের নেপথ্যে কারা জড়িত, সেই সত্য উদ্ঘাটন করতে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান টিম গঠন করা হোক।
ইতিহাস সাক্ষী, মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে কেউ কখনও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। “জুলাই আন্দোলনের জাতিসংঘ রিপোর্ট” নামের এই প্রতারণা আজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সত্য গোপন করা যায় না, কেবল কিছুদিনের জন্য আড়াল করা যায়।
আরো পড়ুন

