Share
দেশের অর্থনীতি যে কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা এখন আর গবেষণার বিষয় নয়। খোদ মাঠের হিসাবই বলে দিচ্ছে ভয়াবহ চিত্র। সাড়ে তিন হাজারের বেশি কারখানা বন্ধ, লাখ খানেক মানুষ বেকার, বিনিয়োগ নেই বললেই চলে, রপ্তানি কমছে, আমদানি থমকে আছে। অথচ এই অবস্থার সৃষ্টি কীভাবে হলো, সেই প্রশ্নটা যেন কেউ করতে চাইছে না।
গত বছর জুলাই মাসে যখন সারাদেশে পরিকল্পিত সহিংসতা শুরু হলো, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটা হয়তো ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকালে পুরো ঘটনাটাই পরিষ্কার হয়ে যায়। একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে সরিয়ে দেওয়ার জন্য যে পরিকল্পিত নাশকতা চালানো হয়েছিল, তার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দেশের বাইরে থেকে অর্থায়ন, মৌলবাদী গোষ্ঠীর সংগঠিত তৎপরতা আর সামরিক বাহিনীর এক অংশের মদদে যে অবৈধ ক্ষমতা দখল সম্পন্ন হয়েছিল, তার ফলাফল এই অর্থনৈতিক ধসই তো স্বাভাবিক।
মুহাম্মদ ইউনুস আর তার তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদ যখন থেকে দায়িত্ব নিয়েছে, তখন থেকেই বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত। কারণ কেউ জানে না আগামীকাল কী হবে। একটা অবৈধ সরকার যেখানে জনগণের ভোটে আসেনি, সেখানে কোন ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে? এই সরকারের কোনো বৈধতা নেই, কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট নেই। ফলে তাদের নেওয়া যে কোনো সিদ্ধান্ত যে কোনো সময় পাল্টে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কে বিনিয়োগ করবে?
ব্যাংক খাতে সুদের হার চৌদ্দ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। একজন ব্যবসায়ী যখন দশ-এগারো শতাংশ মুনাফা করেন, তখন তিনি চৌদ্দ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করবেন কীভাবে? এই সহজ অর্থনীতিটাও কি এই মাইক্রোক্রেডিট বিশেষজ্ঞ বোঝেন না? নাকি বোঝার চেষ্টাই করেন না? ইউনুস যিনি সুদের ব্যবসা করে নোবেল পেয়েছেন, তিনি কি আসলেই চান দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াক?
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তৈরি পোশাক খাতে। এই খাত যেটা দেশের রপ্তানির পঁচাশি শতাংশ, সেই খাতে এক বছরেরও কম সময়ে তিন শ পঞ্চাশটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারালেন। এই শ্রমিকদের পরিবার মিলিয়ে কতজন মানুষ খাদ্য সংকটে পড়লেন, সেই হিসাব কে রাখছে? কিন্তু এই সরকারের কাছে শ্রমিকদের চেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো কীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়।
অথচ এই সরকারই শ্রমিক অধিকারের কথা বলে মাত্র বিশজন শ্রমিক থাকলেই ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিয়েছে। শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এতে কারখানাগুলোতে অরাজকতা সৃষ্টি হচ্ছে। উদ্যোক্তারা ভয় পাচ্ছেন। ছোট একটা কারখানায় যদি তিন-চারটা ইউনিয়ন হয়ে যায়, তাহলে উৎপাদন হবে কীভাবে? এগুলো কি আসলেই শ্রমিক স্বার্থে করা হচ্ছে, নাকি পুরো শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত চেষ্টা?
বিদেশি বিনিয়োগ বাষট্টি শতাংশ কমে গেছে। এই তথ্যটা কি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে না যে বিশ্ব বাংলাদেশকে এখন একটা ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে দেখছে? ক্রেতারা এখন বাংলাদেশ থেকে অর্ডার দিতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ তারা জানেন না কবে আবার দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়ে যাবে। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি না দিতে পারার জন্য জরিমানা দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম যেটা কয়েক দশকে তৈরি হয়েছিল, সেটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাত্র কয়েক মাসে।
আমদানির ক্ষেত্রেও চরম মন্দা চলছে। এলসি খোলা কমেছে বারো শতাংশের বেশি। এর মানে হলো কাঁচামাল আসছে না, যন্ত্রপাতি আসছে না, নতুন প্রকল্পে কেউ হাত দিচ্ছে না। কারণ সবাই অপেক্ষা করছে কখন একটা নির্বাচিত সরকার আসবে। কিন্তু এই অবৈধ সরকার নির্বাচনের কোনো রোডম্যাপই দিচ্ছে না। প্রতিদিন নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করে ক্ষমতায় আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা চলছে।
পুঁজিবাজারও ধসে পড়ছে। গত এক মাসে সূচক চারশ বিশ পয়েন্ট হারিয়েছে। ছোট বিনিয়োগকারীরা যারা তাদের সঞ্চয় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা এখন সর্বস্ব হারাচ্ছেন। কিন্তু এই সরকারের কাছে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়, কীভাবে বিরোধী মতকে দমন করা যায়।
এখন যে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার শতাংশে, এটা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এক বছরের ব্যবধানে সাড়ে তিন লাখ নতুন মানুষ বেকার হয়ে গেছেন। এই বেকার তরুণরা যখন কাজ পাবেন না, তখন তারা কী করবেন? সমাজে অস্থিরতা তো বাড়বেই। কিন্তু হয়তো এটাই এই সরকারের লক্ষ্য। অস্থিরতা বাড়লে জরুরি অবস্থার অজুহাতে ক্ষমতায় থাকা যায়।
আইএমএফ সতর্ক করে দিয়েছে যে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে সামষ্টিক অর্থনীতি বিপদে পড়বে। বিশ্বব্যাংক বলছে সংস্কার করতে হবে। কিন্তু কোন সংস্কার? একটা অবৈধ সরকার যেটার কোনো জনগণের ম্যান্ডেট নেই, সেটা কী ধরনের সংস্কার করবে? সংস্কারের নামে কি আরও বেশি বিদেশি প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে?
মজার ব্যাপার হলো, এই সরকার এসেছিল দুর্নীতি দূর করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু ব্যাংক খাতে যে লুটপাট চলছে, সেখানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পালিয়ে গেছেন, তাদের কতজনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে? বরং নতুন করে ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে আছে। নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, কাজ নেই। মানুষ জানে না আগামীকাল কী হবে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সাধারণ পরিবারগুলো কীভাবে বাঁচবে?
অর্থনীতিবিদরা স্পষ্ট করে বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে কীভাবে? একটা নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই কেবল সেটা সম্ভব। কিন্তু এই অবৈধ সরকার নির্বাচনের কথা শুনতেই চায় না। তারা নানা ধরনের সংস্কারের নামে সময় নষ্ট করছে, আর দেশের অর্থনীতি ডুবে যাচ্ছে।
যে মানুষগুলো গত বছর জুলাইয়ের সহিংসতার পেছনে ছিল, যারা পরিকল্পিতভাবে একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে, তারা কি এই অর্থনৈতিক ধসের জন্য দায়ী নয়? যে বিদেশি শক্তি টাকা জোগান দিয়েছিল, যে মৌলবাদী গোষ্ঠী রাস্তায় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তারা কি এখন খুশি নয়? কারণ তাদের লক্ষ্যই তো ছিল বাংলাদেশকে দুর্বল করা।
দেশের ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে গিয়ে মিনতি করছেন সুদের হার কমানোর জন্য। কারণ উচ্চ সুদে ব্যবসা চালানো অসম্ভব। কিন্তু যে সরকারের বৈধতাই নেই, সে সরকার কি আসলেই দেশের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখবে? নাকি তারা বিদেশি দাতাদের নির্দেশ মেনে চলবে?
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে যদি জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দেশ আরও পিছিয়ে যাবে। কিন্তু এই সরকার কি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারবে? একটা অবৈধ সরকার যেটা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না, সেটা কি আসলেই দেশের উন্নয়ন চায়?
রপ্তানি আদেশ কমছে প্রতি মাসে। ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কারণ তারা দেখছে এখানে কোনো স্থিতিশীলতা নেই। যে কোনো সময় আবার সহিংসতা শুরু হতে পারে। এই ভয়ে তারা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারতের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ হারাচ্ছে তার বাজার।
এখন প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা কতদিন চলবে? যতদিন না একটা নির্বাচিত সরকার আসছে, ততদিন কি এই অর্থনৈতিক পতন চলতেই থাকবে? মানুষ কতদিন এই দুর্ভোগ সহ্য করবে? ব্যবসায়ীরা কতদিন ক্ষতি বইবে? শ্রমিকরা কতদিন বেকার থাকবে? অর্থনীতির যে হাল, তাতে আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এটা এখন নিশ্চিত।
আরো পড়ুন

