Share
যে মামলাকে দশ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে প্রচার করা হয়েছিল, সেই মামলার টাকা পরিশোধ করে দিয়ে বিএনপি নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিল। সোনালী ব্যাংক থেকে ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার হয়ে গেছে, কারণ ড্যান্ডি ডাইং লিমিটেড ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে দিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি আইনি নিষ্পত্তি নয়, এটি বিএনপির নৈতিক দেউলিয়াত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে মামলাকে তারা বছরের পর বছর রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে দাবি করে এসেছে, সেই মামলার টাকা তারা পরিশোধ করল কেন? যদি সত্যিই তারা নির্দোষ হতেন, যদি এটি শুধুই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হতো, তাহলে আদালতে দাঁড়িয়ে নির্দোষিতা প্রমাণ করাই কি যুক্তিসঙ্গত পথ ছিল না? কিন্তু না, বিএনপি সেই পথে হাঁটেনি। কারণ তারা জানে, আদালতে প্রমাণ উপস্থাপিত হলে তাদের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়ে যাবে। তাই টাকা দিয়ে মামলা থামানোই ছিল নিরাপদ পথ।
২০১৩ সালে যখন এই মামলা দায়ের হয়েছিল, তখন থেকে বিএনপি একে আওয়ামী লীগ সরকারের হয়রানি বলে প্রচার করে এসেছে। কিন্তু এখন, ২০২৪ সালে যখন তাদের মিত্ররা ক্ষমতায়, তখন হঠাৎ করে টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে এবং মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, তারা জানত যে অভিযোগ সত্য, কিন্তু যতদিন বিরোধী দলে ছিল ততদিন এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে রাখা সুবিধাজনক ছিল। এখন যখন তাদের সহযোগীরা ক্ষমতায়, তখন চুপচাপ টাকা মিটিয়ে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই অর্থ কার টাকা? এটা দেশের সাধারণ মানুষের টাকা, যে টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা রেখেছে হাজারো সাধারণ আমানতকারী। সেই টাকা ঋণ নিয়ে না ফেরানো হলো, আর যখন আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন দশ বছর ধরে বিষয়টিকে টেনে রাখা হলো। ব্যাংকের এই টাকা লুট করে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়েছে, আর যারা এই অপরাধ করেছে, তারা সংসদে বসে আইন প্রণয়ন করেছে।
বিএনপি সবসময় দাবি করে এসেছে যে তারা গণতন্ত্রের পক্ষে, আইনের শাসনে বিশ্বাসী। কিন্তু তাদের কাজ কি সেই দাবির সঙ্গে মেলে? যে দল নিজেরা ব্যাংক লুটপাট করে, তারপর মামলা হলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে চিৎকার করে, আর শেষে ক্ষমতার কাছাকাছি এলেই চুপচাপ টাকা মিটিয়ে মামলা বন্ধ করে, তারা কোন মুখে গণতন্ত্র ও আইনের কথা বলে?
আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই টাকা পরিশোধ হচ্ছে ঠিক সেই সময়ে যখন দেশে একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। জুলাইয়ে যে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার পরের এই পরিস্থিতিতে বিএনপির এই পদক্ষেপ কাকতালীয় বলে মনে হয় না। যে সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আসেনি, যাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাদের সময়েই এই মামলার নিষ্পত্তি হলো। এটা কি বিএনপির কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়?
বিএনপির নেতারা যখন জনগণের সামনে বক্তৃতা দেন, তখন তারা শেখ হাসিনার সরকারকে ফ্যাসিস্ট বলেন, দুর্নীতিবাজ বলেন। কিন্তু এই ড্যান্ডি ডাইং মামলার টাকা পরিশোধ করা প্রমাণ করে যে আসল দুর্নীতিবাজ কারা। শেখ হাসিনার সরকার যদি সত্যিই প্রতিহিংসাপরায়ণ হতো, তাহলে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করাই কি যথেষ্ট ছিল না? কিন্তু বিএনপি টাকা পরিশোধ করে প্রমাণ করে দিল যে মামলা মিথ্যা ছিল না, অভিযোগ সত্য ছিল।
দেশের মানুষ এখন দেখছে, বিএনপির কথা আর কাজের মধ্যে কতটা ফারাক। তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু কাজে দেখায় ক্ষমতার লোভ। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ভান করে, কিন্তু নিজেরাই ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এই ধরনের দলের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া কি নিরাপদ?
বিএনপির রাজনীতি সবসময়ই ছিল সুবিধাবাদী। তারা যখন যেভাবে সুবিধা পেয়েছে, সেভাবেই অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু ড্যান্ডি ডাইং মামলার এই নিষ্পত্তি তাদের চরিত্রকে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। এখন আর কোনো অজুহাত নেই, কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দাবি নেist। শুধু আছে একটি সত্য, সেটা হলো বিএনপির নেতারা দুর্নীতি করেছিল, এবং এখন সেই দুর্নীতির দায় স্বীকার করে নিয়েছে।
জনগণ ভুলে যায় না। যে দল দশ বছর ধরে মিথ্যা বলে এসেছে, যে দল নিজেদের অপরাধ ঢাকতে রাজনৈতিক প্রচারণা চালিয়েছে, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসা কঠিন। বিএনপি হয়তো ভাবছে যে টাকা দিয়ে মামলা বন্ধ করে তারা বিষয়টি চাপা দিতে পারবে, কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে যে নৈতিক পরাজয়কে কোনো টাকা দিয়ে ঢাকা যায় না।
এই ঘটনা বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দর্পন। যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি দল যারা ক্ষমতার জন্য যেকোনো পথে হাঁটতে পারে, যেকোনো মিথ্যা বলতে পারে, আর যখন সুবিধা আসে তখন নিজেদের অপরাধ ঢাকার জন্য অর্থ ব্যয় করতেও দ্বিধা করে না। দেশের মানুষ এখন সিদ্ধান্ত নেবে, এমন একটি দলকে তারা বিশ্বাস করবে কিনা, যাদের কথা আর কাজে এত বিশাল ফারাক।
আরো পড়ুন

