Share
১৬ ই ডিসেম্বরে সকাল ১০ টায় লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার আ স ম আব্দুর রব সরকারি কলেজ মাঠে বিজয় দিবস উপলক্ষে ‘রাজাকারের পাঠ মঞ্চ’ নাটক মঞ্চস্থ হলে— নারী নির্যাতনের অভিনয়ে পাঞ্জাবি-টুপি পরে অভিনয় করাকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ আখ্যা দিয়ে অনুষ্ঠানে বাধা দেন জামায়াত ইসলামীর নেতারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ‘রাজাকারের পাঠ মঞ্চ’ নাটকে ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এ সময় তারা পাঞ্জাবি-টুপি পরে মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকারের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে নিয়ে অভিনয় করায় মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনে মঞ্চ থেকে প্রতিবাদ জানান উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুর রহিম ও পৌর আমির আবুল খায়ের। তারা মঞ্চ থেকে তেড়ে গিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মাদ আশরাফ উদ্দিনের কাছে বিষয়টির ব্যাখ্যা জানতে চান। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। তখন সেখানে ইউএনও নিলুফা ইয়াসমিন নিপা, রামগতি থানার ওসি লিটন দেওয়ান ও মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাজাকার সংগঠনের আমির আবদুর রহিম বলেন,পাঞ্জাবি-টুপি পরে অভিনয় করায় আমি একজন মুসলমান হিসেবে এ অভিনয়কে মেনে নিতে পারিনি। তাই আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে এ ধরনের অভিনয়ের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলাম।
নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামবিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ‘আপনার জিজ্ঞাসা’–তে ‘লম্বা জামা, টুপি, পাগড়ি কি সুন্নতি পোশাক?’ শীর্ষক একটি প্রশ্নের উত্তরে বিশিষ্ট আলেম ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ বলেনঃ সুন্নতি পোশাক বলতে পোশাকের কোনো নির্দিষ্ট কাটিং সুন্নাহর মধ্যে নেই। সুন্নাহ বলতে আমি বোঝাচ্ছি, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের মধ্যে আসেনি। অর্থাৎ রাসূল (সা.)-এর সহিহ হাদিসের মধ্যে পোশাকের সুনির্দিষ্ট কোনো কাটিং রাসূল (সা.) জানিয়ে যাননি।
সুতরাং লম্বা জামা, টুপি, পাগড়ি এই পেশাকগুলো এভাবে রাসূল (সা.)-এর কোনো সহিহ হাদিসের মধ্যে আসেনি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) পাগড়ি ব্যবহার করেছেন মর্মে সহিহ হাদিস সাব্যস্ত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) জোব্বা ব্যবহার করেছেন মর্মে সহিহ হাদিস সাব্যস্ত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) পাগড়ির নিচে টুপিও পরেছেন মর্মে সহিহ হাদিস সাব্যস্ত হয়েছে।
এগুলো রাসূল (সা.) ব্যবহার করেছেন, এটি প্রমাণিত হয়েছে, এটা রাসূল (সা.)-এর কাজ। তাই এই কাজগুলো কীভাবে ইসলামী শরিয়তের মধ্যে গুরুত্ব দেওয়া হবে, অর্থাৎ প্রকৃত অবস্থানটি কী হবে, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ বা মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ আহলুত তাহকিক, মাহকি ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, নবী (সা.) যেসব কাজ স্বভাবজাত বা মানুষের প্রকৃতিগত কাজ, সেগুলো সবই মূলত আদতের (অভ্যাস, প্রথা বা প্রচলন) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাই রাসূল (সা.) এই কাজগুলো অভ্যাসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে, এগুলো ইবাদতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না।
সুতরাং, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধাপরাধ ঢাকতেই জামায়াত ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করে নিজেদের অপব্যখ্যা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে ইসলামেরই অবমাননা করছে। এছাড়াও, আজকের গোলাম আযম তার পাঞ্জাবী-টুপির লেবাস নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর গঠনের নেতৃত্ব দেয়।
একাত্তরের ঘাতক আলবদর বাহীনির প্রধান মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালে ছিলেন তখনকার জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রধান। মুক্তিযুদ্ধের সময়, বিশেষ করে শেষ কয়েক মাসে এই আলবদর বাহিনী ঢাকা এবং অন্যত্র পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। মতিউর রহমান নিজামী নিজেই তখন সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে আলবদর বাহিনীকে বর্ণনা করেছিলেন “পাকিস্তানের শত্রুদের কাছে সাক্ষাত আজরাইল” বলে। নিজামীর ছবিও গুলোও দেখবেন পাঞ্জাবী-টুপি পড়া।
১৯৭১ খুলনার খান জাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিকে নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। রাজাকার বাহিনী গঠনের পেছনে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতা এ কে এম ইউসুফ, পরবর্তীতে যিনি দলটির নায়েবে আমির হন। এই একে এম ইউসূফের লেবাসও একই।
যেহেতু একাত্তরের ঘাতক-দালাল রাজাকার-আলবদর ও সাবেক জামায়াত নেতারা সকলেই পাঞ্জাবী-টুপি পড়ে গণহত্যা, রেইপে অংশ নেয়, সেহেতু জামায়াতের এসব যুদ্ধাপরাধীদেরকে চিহ্নিত করতেই পাঞ্জাবী-টুপি পড়া রাজাকারের ক্যারেক্টার মঞ্চস্থ করা হয়। তাছাড়া পাঞ্জাবী পরিধানের সংস্কৃতি আরব সংস্কৃতি নয়, মূলত এটা দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, রাজাকার চরিত্রকে মঞ্চস্থ করতে টুপি-পাঞ্জাবির পরিধান ইসলাম অবমাননার সামিল— এ কথা ভিত্তিহীন এবং জামায়াত নেতাদের এই অভিযোগ ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করবারও সামিল।
একাত্তর বিরোধী রাজাকারেরা এদেশকে আবারো জিম্মি করতে চাইছে, এক পাকিস্তান গঠনের দিবাস্বপ্ন এদের মনে এখনো উঁকি দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে এরা ইসলামকে ব্যবহার করতেও দ্বিধা করে না, এই মুনাফেকদের চিনে রাখুন; স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা সমুন্নত রাখতে জামায়াতকে বয়কট করুন। দেশবিরোধী সকল ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলুন জাতিগত ঐক্যের সাথে।
আরো পড়ুন

