Share
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নে যে ভণ্ডামি চলছে, তা শ্রেণিচরিত্রের দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভারতীয় আধিপত্যের প্রতীক বলে গলা ফাটান, তারা আসলে বস্তুগত বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত বাহক হচ্ছে বলিউড, হিন্দি সিনেমা এবং শাহরুখ খানের মতো সাংস্কৃতিক পণ্য। এই সাংস্কৃতিক পণ্যায়ন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের চেতনায় যে হেজিমনি তৈরি করেছে, তা রবীন্দ্রনাথের তুলনায় হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী এবং ব্যাপক। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী শাহরুখ খান বা বলিউডের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করে না। কারণটা পরিষ্কার, ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি তাদের শ্রেণিচেতনাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে ফেলেছে।
এই যে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক রাজনীতি করার চেষ্টা, এটা আসলে শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণিস্বার্থকে আড়াল করার একটা পুঁজিবাদী কৌশল। মোগল সাম্রাজ্যের সাথে তুলনা করলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। দিল্লির মোগল শাসকদের আমলেও বাংলার জনগণ কেন্দ্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, বিদ্রোহ করেছিল। সেই শোষণ মুসলমান শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হলেও বাংলার শাসকশ্রেণি প্রতিরোধ করেছিল। কারণ শোষণের চরিত্র ধর্ম দিয়ে নির্ধারিত হয় না, হয় শ্রেণি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিয়ে। ভারতের বর্তমান ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিবাদী শাসন আসলে সেই একই কেন্দ্রীকৃত আধিপত্যবাদেরই ধারাবাহিকতা। পার্থক্য শুধু এই যে এখন শাসকশ্রেণির ধর্মীয় পরিচয় বদলেছে। কিন্তু তাদের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাভিলাষ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চরিত্র একই রয়ে গেছে।
শাহরুখ খান যে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক দূত, এটা বুঝতে খুব বেশি মার্কসবাদী তত্ত্ব জানার দরকার নেই। তিনি সাংস্কৃতিক পুঁজির একটা প্রতীক যা ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। বলিউড আসলে একটা সাংস্কৃতিক পণ্য উৎপাদনের কারখানা, যেখানে জনগণের চেতনাকে ভোগবাদী এবং প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যবোধে গড়ে তোলা হয়। এই সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে ভারতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তার আদর্শিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে।
অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে যে হৈচৈ, তার পেছনে রয়েছে একটা প্রতিক্রিয়াশীল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী, একেশ্বরবাদী, যা সনাতন হিন্দুধর্মের বহুত্ববাদী এবং বর্ণবাদী কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু এই তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়। কারণ আসল দ্বন্দ্ব এখানে ধর্মীয় নয়, ঐতিহাসিক এবং শ্রেণিগত। পশ্চিম পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি যখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর সাংস্কৃতিক নিপীড়ন চালাচ্ছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধের একটা প্রতীক। ছায়ানটের মতো সংগঠন সেই সময় তৈরি হয়েছিল যখন পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি রবীন্দ্রচর্চাকে দমন করার চেষ্টা করছিল। এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব আজও বহাল আছে। যারা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তারা আসলে ১৯৭১ সালের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্তরসূরি।
এখানে আরেকটা বিরাট আইরনি রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বেশি ভারতকেন্দ্রিক ছিলেন, তার দর্শন অনেক বেশি উদারনৈতিক এবং সার্বজনীন ছিল। কিন্তু তিনি এই প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। এটা প্রমাণ করে যে এদের মূল সমস্যা ভারতীয় আধিপত্য নয়, বরং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এরা মূলত পরিচয়ের রাজনীতির মাধ্যমে শ্রেণিসংগ্রামকে আড়াল করতে চায়।
এই সাংস্কৃতিক এবং আদর্শিক বিভ্রান্তির পরিণতি দেখা গেল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। যা ঘটেছে তা একটা সুপরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র এবং প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থায়নে, ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সংগঠিত সহিংসতার মাধ্যমে এবং সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। এটা ছিল একটা কাউন্টার রেভলিউশনারি কু, যেখানে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ এবং দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মধ্যে একটা অপবিত্র আঁতাত কাজ করেছে।
মুহাম্মদ ইউনূসকে সামনে রাখা হয়েছে এই অভ্যুত্থানের বুর্জোয়া মুখ হিসেবে। এই ব্যক্তি দশকের পর দশক ধরে মাইক্রোফিন্যান্সের নামে গ্রামীণ মেহনতি মানুষের উপর সুদি শোষণ চালিয়েছেন। গরিব মানুষের দারিদ্র্য নিয়ে ব্যবসা করে তিনি পুঁজি সঞ্চয় করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন। তার নোবেল পুরস্কার আসলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর একটা স্বীকৃতি যে তিনি নব্য উদারনৈতিক পুঁজিবাদের আদর্শ সেবক। এখন তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে একটা অবৈধ এবং প্রতিক্রিয়াশীল শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য।
এই অভ্যুত্থানের আসল চালিকাশক্তি হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট সংগঠন। এই সংগঠনগুলো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে মিলে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং লুটপাট চালিয়েছিল। এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল কারণ তারা জানত স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের ধর্মভিত্তিক প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির জায়গা সংকুচিত হবে। ১৯৭১ সালের পরাজয়ের পর থেকে তারা অপেক্ষা করছিল প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় এবং দেশীয় সামরিক আমলাতন্ত্রের সমর্থনে তারা এখন সেই সুযোগ পেয়েছে।
জুলাই ২০২৪ এর সহিংসতা ছিল একটা সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অর্থায়ন এবং কৌশলগত সহায়তায়, ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলোর লাঠিয়াল বাহিনী ব্যবহার করে একটা কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলাকে পুঁজি করে সামরিক আমলাতন্ত্র হস্তক্ষেপ করেছে এবং নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে। এটা ছিল একটা ক্লাসিক কালার রেভলিউশনের মডেল, যা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করে থাকে যেখানে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হুমকির মুখে পড়ে।
এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য শুধু সরকার পরিবর্তন নয়। এটা একটা বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ যার লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজকাঠামোকে পুনর্গঠিত করা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো চায় বাংলাদেশ একটা ধর্মীয় মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ এবং বামপন্থী শক্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা হবে। এই ধরনের একটা রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের জন্য বেশি সুবিধাজনক কারণ ধর্মীয় মৌলবাদ সবসময় শ্রেণিচেতনাকে আড়াল করে এবং জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। একটা বিভক্ত এবং দুর্বল বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের জন্য সহজ লক্ষ্য।
জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনগুলোকে ক্ষমতায় আনার পেছনে রয়েছে একটা সুচিন্তিত কৌশল। এই সংগঠনগুলো শ্রমিক, কৃষক এবং মেহনতি মানুষের স্বার্থের বিপক্ষে দাঁড়ায়। তারা ধর্মের নামে শোষণকে বৈধতা দেয়, নারীর প্রতি বৈষম্যকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করে এবং সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে চায়। এরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে ভালো রক্ষক কারণ এরা শ্রেণিসংগ্রামের বদলে ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং দেশীয় কম্প্রাডর বুর্জোয়ারা জানে যে জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনগুলো তাদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করবে।
রবীন্দ্রনাথ বনাম শাহরুখ খানের যে তুলনা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তা আসলে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দুটো ভিন্ন স্তরকে তুলে ধরে। রবীন্দ্রনাথ একটা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব যার রচনা এবং চিন্তাভাবনা বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। তাকে ভারতীয় আধিপত্যের প্রতীক বলা আসলে ইতিহাসবিকৃতি। অন্যদিকে, শাহরুখ খান এবং বলিউড হচ্ছে সমকালীন সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার যা বাজার অর্থনীতির যুক্তিতে চলে এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে ভারতীয় বুর্জোয়া মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করছে। কিন্তু যারা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে নীরব। এই নৈতিক এবং রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে যে তাদের লড়াই মূলত শ্রেণিসংগ্রামের বিপক্ষে, সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে।
জুলাই ২০২৪ এর অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায়। এটা শুধু একটা সরকারের পতন নয়, বরং গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল শক্তির উপর প্রতিক্রিয়াশীল এবং সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ। মুহাম্মদ ইউনূস এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে যে অবৈধ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বাংলাদেশকে একটা ধর্মীয় মৌলবাদী, সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার এবং শ্রমজীবী মানুষের শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করছে। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে শুধু একটা সরকারকে রক্ষা করা নয়, বরং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করা।
আরো পড়ুন

