Share
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একদিনে ভাঙে না ভাঙে পরিকল্পিতভাবে। আজ যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আর কূটনৈতিক বিশ্লেষণের বিলাসিতা নয় এটি সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। কারা, কেন এবং কোন স্বার্থে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র–চীন বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের সম্মুখমুখী ময়দানে ঠেলে দিচ্ছে?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকৌশল ঘিরে যে প্রশ্ন উঠছে, তা কোনো “গুজব” নয়—এটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার প্রতিফলন। অভিযোগ স্পষ্ট: পরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ অবলম্বন করে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতিকে কার্যত বাতিল করে বাংলাদেশকে একপাক্ষিক নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কৌশল। এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে কোনো জাতীয় ঐকমত্য নেই, নেই সংসদীয় আলোচনা, নেই জনগণের ম্যান্ডেট। আছে শুধু একটি সীমিত রাজনৈতিক ও ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীর হিসাব—যারা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করছে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে। পররাষ্ট্রনীতি যখন রাষ্ট্রের ঢাল না হয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লাঠিতে পরিণত হয়, তখন সেটি কূটনীতি থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রবিরোধী জুয়া।
আর এখানেই সবচেয়ে ভয়ংকর বয়ানটি সামনে আসে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় এমন অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াতের নাম। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র–চীন ভূরাজনৈতিক সংঘাতে টেনে আনার ছক কষা হচ্ছে বলে যে আলোচনা চলছে, তা আর বিচ্ছিন্ন নয়। মার্কিন চীনবিরোধী সামরিক উপস্থিতি, অস্ত্র ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণকক্ষ এসব কথাবার্তা হঠাৎ করে বাতাসে ভেসে আসেনি।
এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে পড়ে। আর মিথ্যা হলেও প্রশ্ন থেকেই যায় এত বড় সন্দেহ জন্মানোর পরিবেশ কে তৈরি করল? রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সংবিধান দিয়ে, সংসদ দিয়ে, রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন দিয়ে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব বক্তৃতা বা বিদেশি প্রশংসাপত্র দিয়ে নয়। সাংবিধানিক বৈধতাকে পাশ কাটিয়ে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার ছক আঁকা হয়, তবে সেটি শুধু রাজনৈতিক অনৈতিকতা নয় এটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করার সরাসরি রাস্তা।
বাংলাদেশ কোনো অক্ষম রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ দর কষাকষি জানে, শর্ত আরোপ করতে জানে, প্রয়োজন হলে না বলতে জানে। এই দেশ শ্রীলঙ্কা নয়, আফ্রিকার কোনো পরীক্ষাগার নয়। কিন্তু আজ যদি রাজনৈতিক স্বার্থ ও অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতার মাঝখানে দাবার ঘুঁটি বানানো হয়, তবে তা হবে ইতিহাসের কাছে এক ভয়ংকর অপরাধ।
আরো পড়ুন

