Share
মুহাম্মদ ইউনুসের তথাকথিত ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান যে ভয়াবহ গতিতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এখন ভারতের এই পদক্ষেপ। একটা দেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান আর সুদানের কাতারে ফেলে দেওয়া হলো। এই তিনটা দেশের কী অবস্থা, সেটা কি ব্যাখ্যা করে বলার দরকার আছে? পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান আর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড লেগেই থাকে, আফগানিস্তানে তালেবান শাসন, আর সুদানে গৃহযুদ্ধ। বাংলাদেশ এখন সেই তালিকায়।
২০২৪ সালের জুলাইতে যে দাঙ্গা হলো, সেটাকে ‘ছাত্র আন্দোলন’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এখনও চলছে। কিন্তু কোন ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়? যে আন্দোলনে কোটা সংস্কারের দাবি ছিল, সেখানে হঠাৎ করে সরকার পতনের দাবি এলো কোথা থেকে? আর সবচেয়ে বড় কথা, যে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছিল, তাকে সেনাবাহিনীর ইশারায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো। এটা কি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, নাকি সামরিক ক্যু?
ইউনুস এবং তার দল যখন ক্ষমতায় বসলো, তখন বলা হলো দেশে ‘গণতন্ত্র’ ফিরে এসেছে। কিন্তু গত দেড় বছরে কী দেখলাম আমরা? দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চলছে একের পর এক। ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে খুন করা হলো, কিন্তু সেই খুনিদের ধরা হলো কি? বরং যারা প্রতিবাদ করতে চাইলো, তাদের ওপরই দমন নামিয়ে আনা হলো। হিন্দু মন্দিরে হামলার খবর এখন আর খবরই না, এটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এদিকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলছেন, ‘ভারত যদি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সমান মনে করে, সেটা তাদের ব্যাপার’। এই কি জবাব? একজন দায়িত্বশীল সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এভাবে কথা বলার কথা?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন কার স্বার্থে চলছে, সেটা পরিষ্কার। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হলে, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতো কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা। কিন্তু না, এই সরকার সরাসরি ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়ে বসলো। এটা কি ক্রিকেট নিয়ে সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক বিদ্বেষ? ক্রিকেট খেলা না হলে ক্ষতি হবে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের, দর্শকদের, ক্রীড়া সংস্থার। কিন্তু সেটা নিয়ে কি এই সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে?
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পেছনে আরও বড় একটা প্রশ্ন আছে। জুলাই দাঙ্গার সময় যে বিদেশি অর্থ এসেছিল, যে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, তাদের উৎস কোথায়? পাকিস্তানের আইএসআই যে এই অস্থিরতার পেছনে ছিল, সেটা কি অস্বীকার করা যায়? আর সেই পাকিস্তান এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এখন মরিয়া এই অবৈধ সরকার। ভারত যখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, যখন সীমান্ত নিরাপত্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা অপরিহার্য, তখন ভারতকে শত্রু বানিয়ে লাভ কার?
ইউনুস সাহেব মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে নোবেল পেয়েছেন, সেটা তার ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু তাতে কি তিনি দেশ চালানোর যোগ্যতা পেয়ে গেলেন? তার তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদে কে কে আছেন? নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, এরা কারা? এদের কী অভিজ্ঞতা আছে প্রশাসন চালানোর? এরা কি কখনো নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, জনগণের ভোট নিয়েছেন? না। এরা ক্ষমতায় এসেছেন রাস্তায় দাঙ্গা বাধিয়ে, আর সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায়। এটাকে গণতন্ত্র বলা যায় না, এটা সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অভ্যুত্থান।
এখন ভারত তার কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নিচ্ছে। এটা কোনো সাধারণ পদক্ষেপ না। এর মানে হলো, ভারত মনে করছে বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা নেই। একটা প্রতিবেশী দেশ, যার সঙ্গে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক বন্ধন, যুদ্ধের সময় যে দেশ বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল, সেই দেশ এখন বাংলাদেশকে বিপজ্জনক মনে করছে। এর দায় কার? যারা দেশ চালাচ্ছেন, তাদের কি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব নেই?
আর সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, এই সরকার নিজেদের ‘সংস্কারক’ বলে দাবি করছে। কী সংস্কার হয়েছে? বিচার বিভাগে? প্রশাসনে? অর্থনীতিতে? কিছুই না। বরং দেশের অর্থনীতি এখন ধসের মুখে। ডলারের দাম আকাশছোঁয়া, রিজার্ভ কমছে, বিদেশি বিনিয়োগ থেমে গেছে। পোশাক শিল্পে অস্থিরতা, রপ্তানি আয় কমছে। আর এসবের মধ্যে এই সরকার ব্যস্ত ভারতের সঙ্গে ঝগড়া করতে।
যে সরকার জনগণের ভোটে আসেনি, যাদের কোনো গণভিত্তি নেই, যারা টিকে আছে শুধু সেনাবাহিনীর সমর্থনে, তারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ভারত ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলো এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। এটা কি সফলতা?
ইউনুস এবং তার দল দেশকে একটা গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক ধস, সামাজিক অস্থিরতা, সবকিছু মিলে বাংলাদেশ এখন একটা বিপজ্জনক জায়গায় দাঁড়িয়ে। আর যতদিন এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন এই সংকট আরও গভীর হবে। ভারত যে বাংলাদেশকে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সমান মনে করছে, সেটা কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটাই বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতা তৈরি করেছে যারা দাঙ্গা বাধিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, তারাই।
আরো পড়ুন

