Monday, March 16, 2026

পশ্চিমা ওহীতে নর্তনরত বিএনপি-জামায়েত, ভারত বিদ্বেষ ও চীনা ড্রাগনে মাঝে ফেঁসে যাওয়া বাংলাদেশ

Share

বাংলাদেশ এখন আর স্বাধীন রাষ্ট্র নেই। ‘২৪ এর জুলাইয়ে যা হয়েছে তাকে যারা ছাত্র আন্দোলন বলছেন, তারা হয় নির্বোধ নয়তো ষড়যন্ত্রের অংশীদার। একটা দেশের নির্বাচিত সরকারকে সশস্ত্র দাঙ্গার মাধ্যমে উৎখাত করে যখন ক্ষমতায় বসানো হয় একজন সুদখোর মহাজনকে, আর তার পেছনে যখন ওয়াশিংটন পোস্টের মতো মার্কিন মিডিয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না কাদের টাকায় আর কাদের নির্দেশে এই পুরো নাটক সাজানো হয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনুস আর তার মার্কিন প্রভুদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব কিংবা জনগণের ভোটাধিকার কোনো বিষয়ই নয়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানো, আর সেই কাজে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা ওয়াশিংটনের ভাড়াটে সৈনিকের মতো। ওয়াশিংটন পোস্টে জামায়াতের পক্ষে যে প্রতিবেদন ছাপা হলো, সেখানে মার্কিন কূটনীতিক পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, “আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।” কোন তাদের? যে সংগঠন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ হত্যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিল, সেই জামায়াতে ইসলামী। যে সংগঠনের নেতারা এক এক করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলেছে, সেই সংগঠনকে এখন ওয়াশিংটন “বন্ধু” বানাতে চায়। এর চেয়ে বড় অপমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আর কী হতে পারে?

বিএনপি আর জামায়াত তো সবসময়ই মার্কিন স্বার্থের সেবাদাস ছিল। জিয়াউর রহমান যখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলেন, তখন থেকেই তিনি আর তার দল আমেরিকার কোলে আশ্রয় খুঁজেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন ভারতের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে একটা স্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছিল, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই সেই নীতি পরিবর্তন করে পাকিস্তান আর আমেরিকার দিকে ঝুঁকলেন। খালেদা জিয়ার আমলে এই প্রবণতা আরও বাড়ল। বিএনপির কাছে দেশের স্বার্থের চেয়ে ওয়াশিংটনের নির্দেশনা সবসময়ই বড় ছিল।

এখন যে প্রশ্নটা উঠছে, তা হলো ভারত কেন তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় গেলেন, রাজ্যসভায় শোক প্রস্তাব হলো। এগুলো দেখে অনেকেই ভাবছেন যে ভারত হয়তো বাংলাদেশে তার নীতি বদলাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনের কূটনৈতিক হিসাব বুঝতে হবে। ভারত বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশে এখন যা চলছে, তার পেছনে রয়েছে মার্কিন মদদ, আর এই পরিস্থিতিতে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ভারতের জন্যই ক্ষতিকর হবে। তাই ভারত এখন সব রাজনৈতিক শক্তির সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভারত জামায়াত কিংবা বিএনপির মতো শক্তিকে সমর্থন করছে।

বাস্তবতা হলো, ভারত বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করছিল, তখন ভারতই এগিয়ে এসেছিল। এক করোড় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, অস্ত্র দিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে নেমেছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, সবক্ষেত্রেই ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করে আসছে। অথচ এই ইউনুস চক্র এখন ভারতবিরোধী বিষোদগার করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বুঝলে এই আত্মঘাতী নীতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দিয়ে ঘেরা। ভারতের সাথে শত্রুতা করে, ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে বাংলাদেশ টিকবে কীভাবে? সীমান্তে উত্তেজনা বাড়লে, বাণিজ্য বন্ধ হলে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু ইউনুস আর তার মার্কিন প্রভুদের কাছে এসব বিষয় মাথাব্যথার কারণ নয়। তাদের লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করা, আর সেই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে চীনকে ঠেকানো।

ওয়াশিংটন পোস্টের সেই প্রতিবেদনটা নিছক একটা সাংবাদিকতা ছিল না। নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে একটা মার্কিন পত্রিকায় জামায়াতের পক্ষে এমন প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার মানে হলো ওয়াশিংটন থেকে একটা স্পষ্ট সংকেত দেওয়া যে, জামায়াতে ইসলামীকে তারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখতে চায়। এটা কূটনৈতিক ভাষায় একটা ঘোষণা। আর জামায়াতের নেতারাও পাবলিকলি বলছে যে তারা ওয়াশিংটনের সমর্থন পাচ্ছে। এর মানে হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে আমেরিকা, আর তারা এটা লুকানোর প্রয়োজনও মনে করছে না।

মার্শা বার্নিকাট ২০১৮ সালে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা নিয়মিত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসায় গিয়ে রাজনৈতিক দেনদরবার করতেন। তিনি এটাকে “ভুল প্রথা” বলেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রথা কারা তৈরি করেছিল? বিএনপি আর জামায়াত। তারাই প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন আবার সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইউনুস সরকার গঠনের প্রতিটি পদক্ষেপে ওয়াশিংটনের নির্দেশনা নিচ্ছে।

যে বিষয়টা সবচেয়ে উদ্বেগজনক, তা হলো বাংলাদেশকে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের প্রক্সি যুদ্ধের মাঠ হিসেবে। আমেরিকা চায় চীনকে ঠেকাতে, ভারত চায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, পাকিস্তান চায় বাংলাদেশে তার পুরনো প্রভাব ফিরিয়ে আনতে। আর এই তিন শক্তির টানাটানির মধ্যে পড়ে বাংলাদেশ হারাচ্ছে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, হারাচ্ছে তার সার্বভৌমত্ব। জুলাইয়ের দাঙ্গায় যে বিদেশি অর্থায়নের কথা এখন প্রমাণিত, সেটা এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এই অর্থ এসেছে কোথা থেকে? কারা এই টাকা দিয়েছে? কেন দিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলেই পুরো চিত্র পরিষ্কার হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একাংশ যে এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল, সেটাও এখন আর গোপন কিছু নয়। একটা নির্বাচিত সরকারকে সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া উৎখাত করা সম্ভব নয়। যখন রাস্তায় সশস্ত্র দাঙ্গা চলছিল, তখন সেনাবাহিনী কী করছিল? তারা হাত গুটিয়ে বসে ছিল না, বরং তারা নীরবে এই ষড়যন্ত্রকে সফল করতে সহায়তা করেছে। এই সেনা কর্মকর্তারা ভুলে গেছেন যে তারা সংবিধানের প্রতি শপথবদ্ধ, কোনো বিদেশি শক্তির প্রতি নয়।

এখন যে সরকার চলছে, তার কোনো সাংবিধানিক বৈধতা নেই। জনগণ তাদের ভোট দেয়নি, তারা কোনো নির্বাচনে জিতে আসেনি। তবু তারা ক্ষমতায় বসে আছে শুধুমাত্র বিদেশি সমর্থনের জোরে। আর এই সরকার এখন যা করছে, তা হলো বাংলাদেশকে একটা পরাশক্তির খেলার মাঠে পরিণত করা। নির্বাচনের নামে যে প্রহসনের আয়োজন চলছে, সেখানে জামায়াত আর বিএনপিকে প্রধান খেলোয়াড় বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। এই দুই দলের অতীত রেকর্ড দেখলেই বোঝা যায় তারা ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের কী হবে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এসব হবে নিত্যদিনের ঘটনা।

বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে হবে যে দেশটা এখন একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয় আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকব, নয়তো হয়ে যাব কোনো পরাশক্তির করদরাজ্য। ইউনুস আর তার দোসররা বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পথে নিয়ে যাচ্ছে। আর বিএনপি-জামায়াত এই কাজে তাদের সবচেয়ে বড় সহযোগী।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত