Share
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব নয়, সেটা হলো স্মৃতিভ্রংশ। কে কখন কোথায় দাঁড়িয়েছিল, কাকে কার পাশে দেখা গিয়েছিল, কোন সুবিধার বিনিময়ে কে নীরব ছিল, এসব প্রশ্ন আমরা খুব দ্রুত ভুলে যাই। সেই ভুলে যাওয়ার সুযোগটাই কিছু মানুষ বারবার কাজে লাগায়। ফারুকীর ক্ষেত্রেও ঠিক এই কাজটাই হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো, মানুষের স্মৃতি এত দুর্বল নয় যে সব ভুলে যাবে।
কৌশিক তাপসের কথা মনে আছে? গানবাংলা চ্যানেলটা যে জোরজবরদস্তি করে কুক্ষিগত করেছিল? সানি লিওনি থেকে শুরু করে নোরা ফাতেহি, নানান নায়িকাদের ঢাকায় এনে মজমা বসাতো। ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক দখলদারির প্রতীক হয়ে উঠেছিল সেই চ্যানেল। ঝোপ বুঝে কোপ মেরে সেই তাপসও কিন্তু জুলাই দাঙার সময়ে প্রোফাইল লাল করেছিল। ভেবেছিল বুঝি রেহাই পাবে। কিন্তু দেশের মানুষ তাপস বাটপারের বাটপারি মাফ করে দেয়নি। এই জায়গা থেকেই ফারুকীর প্রসঙ্গ আসে।
যদ্দুর জানা যায়, জুলাই দাঙার সময়ে ফারুকী অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছিলেন। মানে মাঠের বাস্তবতা থেকে হাজার মাইল দূরে বসে। কিন্তু এখন তিনিই ঠিক করে দিচ্ছেন কে আওয়ামী, কে আওয়ামী নয়। যারা সরাসরি সহিংসতার ভেতরে ছিল, রাস্তায় ছিল, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করার নৈতিক অধিকার তিনি কোন জায়গা থেকে পান? দূরে বসে সবাইকে এক রঙে রাঙানো সহজ, কিন্তু সেটা দায়িত্বশীলতা নয়, সেটা সুবিধাবাদ।
আর যত যাই হোক, ফারুকী যতই কায়দা করুক, ফারুকীর বউ তিশা এমনই চরম আওয়ামী লীগ যে তিশার আওয়ামী অবস্থান লুকোনোর সুযোগ নেই। তিশার রাজনৈতিক অবস্থান তো কোনো গোপন বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে তার প্রকাশ্য অবস্থান, বক্তব্য, সংশ্লিষ্টতা একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গেই যুক্ত। সেই ফারুকী যে ফারুকী সারাজীবন ক্ষমতাসীনদের দালালি করে ফেসবুক ভাসাতেন, আনিসুল হকের স্ক্রিপ্টে ছবি বানাতেন, সেই ফারুকীই হয়ে গেলেন বিশাল আওয়ামী বিরোধী আর আনিসুল হক হয়ে গেলেন আওয়ামী দালাল! এই বিভাজনটা কতটা সৎ, কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
প্রশ্ন হলো, স্বামী যদি নিজেকে সেই দলবিরোধী হিসেবে নতুন করে নির্মাণ করেন, তখন এই দ্বৈত বাস্তবতাকে মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে? ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাজনীতি নির্ধারণ করে না ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির সুবিধা যদি একটি পরিবার একসঙ্গে ভোগ করে থাকে, তাহলে দায় এককভাবে অন্যদের ঘাড়ে চাপানো যায় না। নিজের অতি আওয়ামী পরিচয় কিভাবে লুকোবেন ফারুকী? কিছু তো একটা প্রয়োজন। ফলে ফারুকী তার মনমতো যাকে ইচ্ছা আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেন।
একটা দীর্ঘ সময় ধরে ফারুকী ছিলেন ক্ষমতার আশপাশের সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ। এটা অনুমান নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। রাষ্ট্রঘেঁষা প্রযোজনা, ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের লেখা স্ক্রিপ্টে কাজ করা, সরকারি ও আধা-সরকারি প্ল্যাটফর্মে সুবিধাজনক অবস্থান, এগুলো কোনো গোপন বিষয় ছিল না। সেই সময় ফারুকীর ফেসবুক ভাষা, পাবলিক স্ট্যান্স বা সাংস্কৃতিক রাজনীতি কখনোই ক্ষমতার বিরুদ্ধে ছিল না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ক্ষমতাকে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দেওয়ার কাজ করেছে।
জুলাইয়ের সহিংসতার পর ফারুকীর অবস্থান হঠাৎ করে বদলে যায়। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন যেন তিনি বরাবরই ক্ষমতার সমালোচক ছিলেন। কিন্তু এখানে প্রথম বড় ফাঁকটা ধরা পড়ে। যদি তিনি আদর্শগতভাবে এতটাই বিরোধী হতেন, তাহলে ক্ষমতার সবচেয়ে শক্ত সময়গুলোতে তার কোনো দৃশ্যমান বিরোধিতা কেন দেখা যায়নি? তখন কি ঝুঁকি বেশি ছিল, নাকি তখন সুবিধা ছাড়তে ইচ্ছা হয়নি?
কিন্তু মানুষ যখন অতিরিক্ত ধুরন্ধর হয়ে যায়, সে তার নিজের জগতেই হাবুডুবু খায়। ফারুকীর হয়েছে সেই দশা। ফারুকী জুলাই দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারীদেরও আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেন। ভাবুন, কত বড় ধুরন্ধর এই ফারুকী! সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জুলাইয়ের সহিংসতায় অংশ নেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষদেরও রাজনৈতিক ছাঁচে ফেলে দেওয়া। এতে সত্য চাপা পড়ে, দায় ছড়িয়ে যায়, আর আসল প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়।
সবচেয়ে সমস্যাজনক জায়গা হলো ফারুকীর নতুন ন্যারেটিভে পুরোনো সহযাত্রীদের ভূমিকা। যারা একই সময়ে একই কাঠামোর ভেতরে কাজ করেছে, তাদের একাংশ হয়ে যাচ্ছে দালাল, আর তিনি নিজে হয়ে যাচ্ছেন বিবেকের কণ্ঠস্বর। এই বিভাজন বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। এটা রাজনৈতিক আত্মশুদ্ধি নয়, বরং নির্বাচিত স্মৃতি দিয়ে আত্মরক্ষা। যারা একসময় ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারাই এখন অন্যদের দালাল বলে চিহ্নিত করছেন। যারা স্ক্রিপ্ট লিখেছে, প্রযোজনা করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, তাদের সবাইকে এক লাইনে ফেলে দায় এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতিহাস এত সস্তা না যে এভাবে রি-রাইট করা যাবে।
আগে তো ফারুকীর নিজের এবং তিশার বিচার হতে হবে। কিন্তু হলো না। ফারুকী, তিশারা আওয়ামী লীগের আমলেও উচ্ছিষ্ট খেয়ে পরিপুষ্ট হয়েছে, এখন তো ফারুকীই ক্ষমতাবান! হায়, ইউনূস! বেঈমান ইউনূস! ইউনুসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেউ তাকে ত্রাতা বলে, কেউ সুযোগসন্ধানী বলে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার, ক্ষমতা হস্তান্তর, সহিংসতা, বিদেশি প্রভাব, এসব প্রশ্নে এখনো পরিষ্কার ও যাচাইযোগ্য উত্তর সামনে আসেনি।
ফারুকীর ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি আছে। যতই নতুন পরিচয় বানানো হোক, পুরোনো কাজ, পুরোনো সম্পর্ক আর পুরোনো নীরবতা মুছে যায় না। বিশেষ করে যখন তিনি নিজেই অন্যদের রাজনৈতিক চরিত্র সনদ দিতে শুরু করেন। সমস্যা এই নয় যে ফারুকী মত বদলেছেন। সমস্যা হলো তিনি সেই বদলের মূল্য স্বীকার না করেই নিজেকে নৈতিক উচ্চতায় বসাতে চাইছেন। রাজনীতিতে অবস্থান বদলানো বৈধ, কিন্তু ইতিহাস অস্বীকার করে নৈতিকতা দাবি করলে প্রশ্ন উঠবেই।
ইতিহাসে দেখা গেছে, যারা নিজেদের খুব চালাক ভাবে, শেষ পর্যন্ত তারাই নিজেদের বোনা জালের ভেতর আটকে পড়ে। ধারণা করি, যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক আর ফারুকী যত ধুরন্ধরই হোক, ফারুকী যত কর্মকাণ্ড করে মানুষকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করুক, তাপস যেমন নানান কাণ্ডকারখানা করে রেহাই পায়নি, ফারুকীও রেহাই পাবে বলে মনে হয় না। জনরোষ সামলাতে না পেরে সরকার ফারুকীর বিচার করবেই করবে।
এই কারণেই সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। সাংবাদিকরা অবশ্যই ফারুকীর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের তদন্ত করবেই। এটা করতেই হবে। কে কখন কী সুবিধা পেয়েছে, কার বক্তব্য কখন বদলেছে, কে কোথায় ছিল, কারা লাভবান হয়েছে, এগুলো প্রকাশ হতেই হবে। এখানে দরকার তথ্য, টাইমলাইন, আর স্বাধীন সাংবাদিকতার কাজ। কে কখন কী সুবিধা পেয়েছে, কে কখন চুপ ছিল, আর কে কখন কথা বলা নিরাপদ মনে করেছে। এসব প্রশ্নের উত্তর বের না হলে ফারুকীর নতুন পরিচয় একটা কৌশল হিসেবেই থেকে যাবে, বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক রূপান্তর হিসেবে নয়।
মানুষ ভুলে যায় ঠিকই, কিন্তু সব ভুলে যায় না। তাপস তার প্রমাণ। ক্ষমতার রং বদলায়, মুখোশ বদলায়, কিন্তু স্মৃতির দায় থেকে কেউ চিরকাল পালাতে পারে না। সত্য চেপে রাখা যায়, মুছে ফেলা যায় না। আর সেই সত্য সামনে আনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদেরই।
আরো পড়ুন

