OHCHR রিপোর্টে রোহিঙ্গা জঙ্গি, KNF সংযোগ, স্নাইপার হামলা ও গোপন ফরেনসিক বিশ্লেষণ নিয়ে নতুন বিতর্ক

Share

সালাহউদ্দিন আহমেদ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় সংকট নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR) যে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তা প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে নিহতের সংখ্যা, বলপ্রয়োগের প্রেক্ষাপট, পুলিশ হত্যাকাণ্ড, জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে।

OHCHR রিপোর্টে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি গেজেটে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮৩৪ বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্বাধীন সূত্রে আরও ভিন্ন সংখ্যা দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘের কাছে ১,৪০০ সংখ্যাটি কারা সরবরাহ করেছে? যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটি গ্রহণ করা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি গেজেটে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮৩৪ কেন বলা হয়েছে?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার তদন্তের ক্ষেত্রে “Verification, Corroboration and Chain of Evidence” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশের আগে স্বাধীন ফরেনসিক, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, হাসপাতাল রেকর্ড, পোস্টমর্টেম, ডিজিটাল প্রমাণ এবং রাষ্ট্রীয় নথির মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু একই ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারি গেজেট, রাজনৈতিক সূত্র এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেলে সেই রিপোর্টের নিরপেক্ষতা ও উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নিহতদের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক তদন্ত ও ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের কাছে পুলিশ হত্যা ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা: কেন কম গুরুত্ব?

আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনা সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে পুলিশ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে সেতুর উপর ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাও আলোচনায় আসে। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, টেলিভিশন ভবন, জেলখানা ও নিরাপত্তা অবকাঠামোতে ভয়াবহ হামলার হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত সহিংসতা, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা এবং সশস্ত্র আক্রমণও গুরুতর অপরাধের আওতায় পড়ে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা “Targeted Violence against State Officials”, “Political Terror” এবং “Crimes against Public Order” হিসেবেও মূল্যায়িত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অন্যতম মূলনীতি হলো “Principle of Equality of Victims” অর্থাৎ, একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনরত একজন পুলিশ সদস্যের জীবনও সমানভাবে সুরক্ষিত। কোনো তদন্ত যদি শুধুমাত্র একপক্ষীয় হতাহতের বিবরণ তুলে ধরে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিহত সদস্যদের উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি “Selective Human Rights Documentation” হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জাতিসংঘের রিপোর্টে এসব ঘটনার প্রতিফলন ও গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে সীমিত কেন? যদি কোনো তদন্ত শুধুমাত্র বেসামরিক হতাহতের বিবরণ তুলে ধরে কিন্তু নিহত পুলিশ সদস্য, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর হামলা বা সংগঠিত সহিংসতাকে পর্যাপ্তভাবে মূল্যায়ন না করে, তাহলে সেটি “Selective Human Rights Documentation” হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রের দায় বনাম পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার

OHCHR রিপোর্টে “extrajudicial killings” এবং “mass shootings of protesters”এর মতো গুরুতর অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও স্বীকার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এখানে দুটি সমান্তরাল নীতি কার্যকর থাকে।

প্রথমত, “State Responsibility” রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে unlawful killing, excessive force বা extrajudicial use of force প্রতিরোধ করা।

International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR) এবং UN Basic Principles on the Use of Force and Firearms অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয় (necessary), আনুপাতিক (proportionate) এবং আইনসম্মত (lawful)।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইন এটিও স্বীকার করে যে, পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী বাহিনী যদি সশস্ত্র হামলা, প্রাণঘাতী আক্রমণ বা সংগঠিত সহিংসতার মুখে পড়ে, তাহলে তাদের আত্মরক্ষামূলক শক্তি প্রয়োগের অধিকার রয়েছে জাতিসংঘের নীতিমালায় lethal force কেবল তখনই বৈধ হতে পারে, যখন তা “strictly unavoidable to protect life” অর্থাৎ জীবন রক্ষার জন্য একান্ত অপরিহার্য।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মরক্ষার অধিকার এই দুটি নীতি একে অপরকে বাতিল করে না; বরং একই সঙ্গে কার্যকর থাকে। পুলিশ হত্যার ঘটনাগুলো কেন আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পায়নি? স্নাইপার হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র কারা ব্যবহার করেছে? স্নাইপার হামলা ও অস্ত্রের উৎস নিয়ে নতুন প্রশ্ন

স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়, আন্দোলনের সময় স্নাইপার হামলায় বহু শিক্ষার্থী মাথা ও চোখে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এসব ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল? সেই গুলির উৎস কোথায়? বাংলাদেশ পুলিশ সাধারণত যে ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে না।

ফরেনসিক তদন্ত গোপন রাখা ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংস ঘটনাবলিতে নিহত ছাত্রদের মৃত্যু, স্নাইপার হামলা, ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন যদি সত্যিই নিরপেক্ষ বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক ও ব্যালিস্টিক রিপোর্ট আজও কেন প্রকাশ করা হয়নি?

আন্তর্জাতিক তদন্ত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা বা গণমৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত (autopsy), ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণ, স্নাইপার trajectory mapping, অস্ত্রের উৎস নির্ধারণ, এবং chain of custody এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৎকালীন ইউনুস সরকার নিহত ছাত্রদের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক তদন্ত বাধাগ্রস্ত করেছিল। আরও গুরুতর বিষয় হলো, পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও FBI সংশ্লিষ্ট সদস্যরা বিভিন্ন নমুনা, ব্যালিস্টিক তথ্য ও বিশ্লেষণ সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেও সেই রিপোর্ট জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি।

এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে Transparency বা স্বচ্ছতা কোথায়? যদি তদন্ত নিরপেক্ষ হয়ে থাকে, তাহলে forensic findings গোপন রাখার কারণ কী? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে accountability কখনো selective হতে পারে না। Victims’ Right to Truth কি লঙ্ঘিত হয়েছে? কে গুলি চালিয়েছে, কোন অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, কোন দিক থেকে গুলি এসেছে, এবং কোন command structure এর অধীনে force ব্যবহৃত হয়েছে। Ballistic Evidence প্রকাশ না হওয়া কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত?

যখন কোনো সংঘাতের narrative একতরফাভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে দায়ী করে, অথচ পূর্ণাঙ্গ forensic evidence প্রকাশ করা হয় না, তখন আন্তর্জাতিক প্রশ্ন ওঠে তদন্ত কি impartial ছিল? নাকি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক narrative প্রতিষ্ঠার জন্য evidence selectively ব্যবহার করা হয়েছে?

আন্তর্জাতিক তদন্ত কি পূর্ণাঙ্গ ছিল? আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী credible investigation বলতে বোঝায় protesters, পুলিশ, রাষ্ট্রীয় বাহিনী, armed actors, extremist infiltration, এবং third-party violence সবকিছুকে সমানভাবে তদন্ত করা। কিন্তু যদি পুলিশ হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র হামলা, জঙ্গি সম্পৃক্ততা বা law enforcement installations-এ আক্রমণের বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়, তাহলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। Rule of Law বনাম Political Targeting গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতেই পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের মূল নীতি হলো অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে হবে, রাজনৈতিক পূর্বধারণার ভিত্তিতে নয়। আন্তর্জাতিক আইনে “Chain of Custody”, “Forensic Integrity” এবং “Independent Verification” ছাড়া কোনো বড় ধরনের মানবাধিকার অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ও “Non-State Armed Actors”

আন্দোলনের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ, সশস্ত্র গোষ্ঠী বা উগ্রবাদী উপাদানের সম্পৃক্ততার প্রকাশ্যে দেখা যায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবশালী নেতা যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারী অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছিল বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প-সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের শতাধিক ব্যক্তিকে আন্দোলনের সময় দেখা যায়।

ঢাকার আন্দোলনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি আজও অমীমাংসিত, আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা, তাহলে সীমান্তঘেঁষা চট্টগ্রাম ও পাহাড়ি অঞ্চলের সশস্ত্র নেটওয়ার্ক, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক জঙ্গি সংগঠিত সহিংস গোষ্ঠীগুলোর শতাধিক সদস্য কেন রাজধানীমুখী হয়েছিল? কারা তাদের চলাচল, আশ্রয় বা লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল?

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতায় যখন সীমান্তাঞ্চল, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পাহাড়ি অঞ্চলে বহু বছর ধরে অস্ত্র, চোরাচালান, জঙ্গি নেটওয়ার্ক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ ছিল, তখন আন্দোলনের সময় সেই সম্ভাব্য সংযোগগুলো কি যথেষ্টভাবে তদন্ত করা হয়েছিল?

আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম রয়টার্সে তাদের অনুসন্ধানে উল্লেখ করেছে যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়োগ, সীমান্ত পারাপার ও মিলিট্যান্ট মবিলাইজেশনের অভিযোগ ছিল। সেখানে ARSA ও RSO-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক, অস্ত্র চলাচল ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকির কথাও উঠে আসে।

একইভাবে পাহাড়ি অঞ্চলে KNF-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র তৎপরতা ও জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছিল। কেএনএফ (KNF) বা কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট (Kuki National Front) হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের একটি সশস্ত্র কুকি গোষ্ঠী। তবে, তারা ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো দখল করার জন্য মণিপুরে হামলা করেছিল তাদের প্রধান দাবি হলো ভারতের সংবিধানের আওতার ভেতরে থেকে কুকি উপজাতিদের জন্য মণিপুরের পাহাড়ি এলাকা নিয়ে একটি পৃথক ‘কুকিল্যান্ড’ (Kukiland) রাজ্য গঠন করা।

মণিপুর জাতিগত সংঘাত ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে যে ভয়াবহ সহিংসতা শুরু হয়, তা মূলত রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই (Meitei) সম্প্রদায় এবং পাহাড়ি উপজাতি কুকি-জো (Kuki-Zo) সম্প্রদায়ের মধ্যকার একটি অভ্যন্তরীণ জাতিগত সংঘাত। মেইতেইদের ‘তফসিলি উপজাতি’ (ST) মর্যাদা চাওয়ার বিরোধিতা করে কুকি ও অন্যান্য উপজাতিরা আন্দোলন শুরু করলে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের কেএনএফ-এর মধ্যে পার্থক্য বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় থাকা ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (KNF) বা বম পার্টি এবং ভারতের মণিপুরের ‘কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (KNF) দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের সংগঠন। তবে তাদের জাতিগত উৎস বা মূলধারা (Kuki-Chin-Mizo) এক হওয়ায় এবং সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় কৌশলগত কিছু সম্পর্ক বা অস্ত্রের যোগসূত্র রয়েছে।

ঢাকার আন্দোলনে কি কোনো “third force” ঢুকে পড়েছিল?

সংগঠিত সহিংসতার পেছনে কারা অর্থ, পরিবহন ও সমন্বয় দিয়েছে? সীমান্ত ও পাহাড়ি অঞ্চলের সশস্ত্র উপাদান কি রাজধানীর অস্থিরতাকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে? বিদেশি গোয়েন্দা, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক বা উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর কোনো ভূমিকা ছিল কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। তাই দায়িত্বশীল অবস্থান হলো অভিযোগকে তথ্য হিসেবে নয়, বরং স্বাধীন তদন্তের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা। কারণ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত মানে শুধু “কে গুলি চালালো” তা দেখা নয়; বরং এটাও খতিয়ে দেখা কারা সংঘাতকে উসকে দিল কারা সহিংস গোষ্ঠী ঢুকালো, কারা রাষ্ট্রীয় সংকটকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করলো, এবং কারা সাধারণ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের আড়ালে ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করলো।

বাংলাদেশের ২০২৪ সংকট ছিল শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; এটি ছিল নিরাপত্তা, গোয়েন্দা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল সংঘর্ষের একটি বহুমাত্রিক অধ্যায়। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে “Non-State Armed Actors” বা অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের বিষয়। যদি কোনো আন্দোলনের মধ্যে জঙ্গি, উগ্রবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে আন্তর্জাতিক তদন্তে সেটিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন তদন্তযোগ্য, তেমনি রাষ্ট্রবিরোধী হামলা, অস্ত্র লুট, নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা এবং পরিকল্পিত সহিংসতাও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভিডিও, প্রমাণ ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

OHCHR প্রকাশিত কিছু ভিডিও ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন, বিভিন্ন ভিডিওর পূর্ণ প্রেক্ষাপট বা ঘটনার আগের অংশ প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক হামলা, পুলিশ হত্যা জীবন্ত মানুষ কে পুড়িয়ে হত্যা লএবং সহিংসতার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো:

“Justice must not only be done, but must also be seen to be done.” যেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, আন্দোলনকারী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সম্ভাব্য তৃতীয় পক্ষ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভিযোগ সবকিছু সমানভাবে তদন্ত করা হবে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো সংঘাত বা রাজনৈতিক সহিংসতার তদন্ত শুধুমাত্র নিহতের সংখ্যা গণনার বিষয় নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ “Contextual Legal Assessment”,যেখানে প্রতিটি ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট, সংগঠিত সহিংসতা, অস্ত্রের উৎস, পরিকল্পিত হামলা এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রভাব সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত