মাকুন্দা উপদেষ্টা জাহাঙ্গীরের হাত থেকে বাঁচবে কি আসন্ন ক্রিসমাসে যীশু খ্রিস্টের দাঁড়ি?

Share

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু হাস্যকর নয়, তা দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধান এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার সরকারের তীব্র ঘৃণারই বহিঃপ্রকাশ। দুর্গাপূজার সময় দেশজুড়ে ৭৯৩টি পূজামণ্ডপে অসুর প্রতিমার মুখে দাঁড়ি লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টির ঘটনায় তিনি ‘ফ্যাসিস্ট বুদ্ধিজীবীদের ইন্ধন’কে দায়ী করেছেন। কিন্তু এই বক্তব্যের পেছনে লুকিয়ে আছে তার নিজস্ব ব্যক্তিগত আক্ষেপ, যা তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। এই অবৈধ সরকারের হাতে যদি দুর্গাপূজার অসুরের দাঁড়ি ‘অপরাধ’ হয়ে ওঠে, তাহলে আসন্ন ক্রিসমাসে যীশু খ্রিস্টের দাঁড়ি কি বেঁচে থাকবে? এই প্রশ্নটি আজ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে ভয়ের ছায়া ফেলেছে।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী নিজেই একজন ‘মাকুন্দা’ পুরুষ—যার বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই ঠিকমতো দাঁড়ি-গোঁফ গজায়নি। খালি চোখে দেখে ক্লিন-শেভড ভাবলে ভুল হবে, কারণ প্রকৃতি তাকে সেই সুযোগই দেয়নি। সেই ব্যক্তিগত আক্ষেপের হিংসার জ্বালা থেকেই তিনি বাউল-ফকিরদের চুল-দাঁড়ি জোর করে কাটার জন্য জামাতের মোল্লাদের ‘ইন্ধন’ দিচ্ছেন, আবার দুর্গাপূজার অসুরের দাঁড়ি কাটতে ডিসি-এসপি-ইউএনওদের পাঠাচ্ছেন।

গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটি সভার পর সাংবাদিকদের সামনে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “অসুরের মুখে দাঁড়ি লাগানোর ঘটনায় তদন্ত চলছে। এর পেছনে ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র রয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চক্রান্ত।” কিন্তু এই ‘তদন্ত’-এর নামে কি শুধু সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের নতুন অধ্যায় লেখা হচ্ছে?

অসুরের মুখে দাঁড়ি থাকা বা না থাকা নিয়ে বিতর্ক করা মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাচীন শিল্পকর্ম, সাহিত্য এবং পুরাণে অসুরের দাঁড়ির উল্লেখ রয়েছে—যেমন রামায়ণ-মহাভারতের চিত্রণে অসুররা প্রায়শই দাঁড়িওয়ালা হিসেবে বর্ণিত। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুধু অজ্ঞতার প্রমাণ দেয়। কিন্তু জাহাঙ্গীরের উদ্দেশ্য কখনো জ্ঞান বা সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নয়; তা হলো সংখ্যালঘুদের উপর আধিপত্য বিস্তার, তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ধ্বংস করা। গত মাসে ময়মনসিংহে এক ফকিরের চুল-দাঁড়ি জোর করে কাটার ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কিন্তু এর পেছনে জামাতের মোল্লাদের ভূমিকা কতটা স্পষ্ট, তা তদন্তে আসেনি। একইভাবে, পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর, অসুরের দাঁড়ি-মুখ ঢেকে দেওয়া—এসব সাম্প্রদায়িক উস্কানির অংশ, যা এই সরকারের নীরব সমর্থন পাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, দাঁড়ি কি জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বাপের সম্পত্তি? কে রাখবে আর কে রাখবে না, তা কি এই অবৈধ সরকার নির্ধারণ করবে? এই সরকারের অবৈধ ক্ষমতাদখলের পেছনে রয়েছে বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থ, ইসলামিক জেহাদি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থন। জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার দাঙ্গা, নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল—সবই এই সরকারের ফ্যাসিস্ট চরিত্রের প্রমাণ। তারা দেশের সংবিধানকে পদদলিত করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে এবং সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তারা জামাতের মোল্লাদের রাস্তায় নামিয়ে বাউল-ফকিরদের চুল-দাঁড়ি জোর করে কাটছে, অন্যদিকে হিন্দুদের দুর্গাপূজায় অসুরের দাঁড়ি নিয়ে মিথ্যাচার ছড়াচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে) এসব ঘটনাকে ‘মানবিক মর্যাদার অপমান’ বলে নিন্দা করেছে, কিন্তু সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই।

সামনে তো আসছে ক্রিসমাস—খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন। ধর্মবেত্তাদের মতে, এই মহাপুরুষেরও দাঁড়ি ছিল, যা খ্রিস্টান শিল্পকর্ম এবং বাইবেলের চিত্রণে স্পষ্ট। জাহাঙ্গীরের গৃহীত পদক্ষেপের হিসাব অনুযায়ী, তাহলে কি পরবর্তী টার্গেট হতে যাচ্ছে যীশু খ্রিস্ট? তার দাঁড়িও কি আদৌ বাঁচবে? নাকি দুর্গাপূজার অসুরের মতো তার দাঁড়িও এই ‘ফ্যাসিস্ট-বিরোধী তদন্ত’-এর শিকার হবে? এই সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতার মৃত্যু ঘটছে ব্যক্তিগত আক্ষেপের রাজনীতিতে, যা সংখ্যালঘুদের জন্য নতুন যুগের অন্ধকার ডেকে আনছে। দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে এখনই উঠে দাঁড়াতে হবে, নয়তো যীশুর দাঁড়ির পরবর্তী হতে পারে আরও অনেক ধর্মীয় প্রতীকের অপমান।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত