সেন্টমার্টিন ঘিরে বিদেশি মোড়লদের আধিপত্য বিস্তারের খেলা

Share

নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তর ইরানি গণমাধ্যম পার্সটুডের সূত্র ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে, বাংলাদেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও সেন্টমার্টিন দ্বীপকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাটিতে রুপান্তরিত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৌশলগত দ্বীপ সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য মার্কিন চাপ আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনার উপর সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে।

মালাক্কা প্রণালীতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ার কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপ সামরিক ও বাণিজ্যিক যান চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্বীপটি যে নিয়ন্ত্রণ করবে সেই ভারত মহাসাগরে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি ‘Free and Open Indo-Pacific’ পরিকল্পনার কাঠামোর মধ্যে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলের অংশ, যেখানে চীন ও ভারত তাদের নিরাপত্তা জন্যও এ অঞ্চলের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে চায়।

আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের দাবি মতে, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সরকার পতনের আন্দোলনের সাথে পশ্চিমা সমর্থিত রঙিন বিপ্লবের স্পষ্ট মিল রয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভগুলো দ্রুত রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। যুব ও ছাত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা, কোডেড বার্তার ব্যবহার, আন্তর্জাতিক এনজিওগুলির ব্যাপক কার্যকলাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হিংসাত্মক ছবি বিতরণ- এই সব কৌশলই ইউক্রেন, জর্জিয়া এবং সার্বিয়াতেও দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন মার্কিন নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন স্বাধীন সরকারগুলোর উপর পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করতে এ ধরনের কৌশলের উপর নির্ভর করে।

ফ্যাসিস্ট ইউনূসকে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর যদিও তাকে একজন সংস্কারকামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়, তবুও ক্লিনটন পরিবার এবং জর্জ সোরোসের সঙ্গে সম্পর্কিত ফাউন্ডেশনসহ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাকে বাংলাদেশের নেতৃত্বের জন্য ওয়াশিংটনের পছন্দের বলে মনে করা হয়। হাসিনার আমলে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরাসরি আমেরিকান চাপে ইউনূসের বিরুদ্ধে করা মামলাও স্থগিত করা হয়েছিল। এখন ক্ষমতায় তার প্রত্যাবর্তনকে পর্যবেক্ষকরা এই অঞ্চলে পশ্চিমা স্বার্থকে কেন্দ্র করে ‘রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্নির্ধারণ’ হিসাবে দেখছেন।

বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন তার মেয়াদকালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে একটি সামরিক ঘাঁটি মালিকানার জন্য তাকে চাপ দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন যে তিনি যদি এই অনুরোধ গ্রহণ করতেন, তাহলে তিনি পশ্চিমাদের রাজনৈতিক সমর্থন বজায় রাখতেন।

যদিও বর্তমান প্রশাসন এবং আমেরিকান কর্মকর্তারা এই বিবৃতিগুলিকে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন, কূটনীতিকদের বহিষ্কার এবং ঢাকা সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যমের কঠোর অবস্থান এই সন্দেহকে আরও জোরদার করে বলছে যে, ওয়াশিংটন তার স্বার্থ অনুসারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে চাইছে।

গত এক বছর ধরে কয়েক মাসের অস্থিরতা এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির পর বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিলেও, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এখনও উত্তেজনাপূর্ণ এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের অভিযোগে জর্জরিত। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দেশটি এখন ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং নয়াদিল্লির মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। নতুন করে সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছে আমেরিকা। চীন তার বাণিজ্য রুট এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে। অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশকে বিদেশী শক্তির প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল তার অভ্যন্তরীণ ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং সমগ্র ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকেও প্রভাবিত করবে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত