Share
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের কাছ থেকে। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকা প্রকাশ করে তদন্ত শুরু হবে। এই তদন্ত কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সেনা সদর দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এর আওতায় আসবেন। এই পদক্ষেপকে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও সামরিক কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক কৌশল এবং জামায়াত-ইসলামীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তের পরিধি
তাজুল ইসলাম ঘোষণা করেছেন, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, কুমিল্লা, সাভার ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অঞ্চলের জিওসি, ব্রিগেডিয়ার এবং ফিল্ড পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম তদন্তের আওতায় আনা হবে। এছাড়া, সেনা সদর দপ্তরের অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল (এজি), ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক, এনএসআই-এর ডিআইজি এবং পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারাও তদন্তের মুখোমুখি হবেন। তিনি বলেন, “দেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য এই তদন্ত অপরিহার্য। যারা দায়িত্বের অপব্যবহার বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজনৈতিক কৌশল ও জামায়াতের প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত ঘোষণার পেছনে ইউনুস সরকারের গভীর কৌশল থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের নেতৃত্ব নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে অনাস্থা ও সন্দেহের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, ইউনুস সরকার সেনা কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অনেকে মনে করছেন, আইনি জটিলতার আড়ালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক নিযুক্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে।
এই তদন্তকে কেউ কেউ জামায়াত-ইসলামীর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) জামায়াতের প্রভাবে তাদের পুরনো হিসাব মিটানোর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তাজুল ইসলামের অতীত রেকর্ড এই অভিযোগকে আরও জোরদার করে। ২০১৩ সালে তিনি জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পক্ষে আইনি লড়াই করেছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।
আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
আইসিটি-এর মামলাগুলো নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের ভূমিকাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাবেক জামায়াত-শিবির নেতা এবং ল ল্যাবের প্রধান হিসেবে শিশির আদালতকে জামায়াতের রাজনৈতিক লাভের মঞ্চে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ। তাঁর হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এই ঘটনা আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পাকিস্তানের আইএসআই-এর সংযোগ?
সূত্রের দাবি, তাজুল ইসলামের তদন্ত তালিকা তৈরিতে পাকিস্তানের আইএসআই এবং জামায়াত-সমর্থক কিছু অফিসার সহযোগিতা করছেন। এর উদ্দেশ্য হলো সেনা প্রধানদের সরিয়ে জামায়াত-পন্থীদের নিয়োগ করা, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই তদন্তকে ইউনুস সরকারের ‘সংস্কার’ নামের আড়ালে সামরিক কাঠামো ভাঙার কৌশল হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সামরিক-নাগরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
তাজুল ইসলামের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে দেখছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না আসায় সামরিক বাহিনীতে এক ধরনের নীরব আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি যেকোনো সময় উত্তপ্ত রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতির সামনে প্রশ্ন
তাজুল ইসলামের তদন্ত কি সত্যিই ন্যায়বিচারের পথে, নাকি জামায়াত-ইসলামীর হাতে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র? এই তদন্তের মাধ্যমে কি বাংলাদেশের সামরিক-নাগরিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় আস্থা পুনর্গঠিত হবে? জনগণের সচেতনতা ও সতর্কতাই এখন এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে।
আরো পড়ুন

