Share
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘সহানুভূতি’ দেখিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ঘনিষ্ঠজনকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে বসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর দেখভালের অজুহাত তুলে একসময় সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করলেও, গত ১৪ মাসে তিনি ১৪ বারেরও বেশি বিদেশ সফর করেছেন। একইসঙ্গে, এসব সফরে তার সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমানে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদকে। এদিকে ইউনূসের ঘনিষ্ঠ আরও বেশ কয়েকজন নারী উপদেষ্টা রয়েছেন। তারা বিতর্কিত হলেও থাকছেন বহাল পদে।
এরমধ্যে একজন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। গত জুলাইতে মাইলস্টোন স্কুলে দুর্ঘটনার কোথাও দেখা যায়নি এই উপদেষ্টাকে। এরপর তাঁকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। এরপরও তিনি নিজ পদে বহাল রয়েছে। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর হয়তো আমরা কেউ থাকবো না। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ এনজিও আপনাদের পাশে থাকবে সব সময়।
এদিকে পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে না পারলেও সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাওয়া ঠিকই বন্ধ করেছেন। সূত্র বলছে, ধীরে ধীরে সরকার এমন ব্যবস্থা করতে চায় যাতে এই সেন্টমার্টিনে সাধারণ পর্যটক না যায়। এতে খুব সহজেই এটি আমেরিকার কাছে তুলে দেওয়া যাবে।
‘অসুস্থ’ স্ত্রীর অজুহাত, ক্ষমতার মজায় বিদেশ সফর
গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অর্থপাচারসহ শতাধিক মামলা ছিল। এ প্রেক্ষা পটে ড. ইউনূস বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যে তাঁর অসুস্থ স্ত্রী তাঁর সহায়তা ছাড়া চলতে, ফিরতে বা খেতে পারেন না, এবং তাকে জেলে পাঠানো হলে তাঁর স্ত্রীর মারাত্মক সমস্যা হবে। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই ‘অসুস্থ’ স্ত্রীকে বাংলাদেশে রেখেই তিনি একের পর এক বিদেশ সফর করছেন, যার মধ্যে অনেকগুলোই অপ্রয়োজনীয় বলে অভিযোগ উঠেছে। জনগণের অর্থ অপচয় করে তিনি এসব সফরে গেছেন।
সর্বশেষ তার চলতি ইতালি সফরও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা হচ্ছে। ইতালির রোমে মেয়রের সাথে সাক্ষাতের সময়ও তাঁর পাশে দেখা গেছে লামিয়া মোর্শেদকে, যাকে ড. ইউনূসের ‘বান্ধবী’ বা ‘ফ্রেন্ড উইথ বেনিফিটস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লামিয়া মোর্শেদের সঙ্গে ইউনূসের এই ঘনিষ্ঠ আচরণ নিয়ে নেটিজেনরা নানারকম সমালোচনা করছেন
‘ডি-ফ্যাক্টো’ প্রধান উপদেষ্টা লামিয়া মোর্শেদ!
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাতকে তোয়াক্কা না করে লামিয়া মোর্শেদকে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক বানানোর অভিযোগ উঠেছে। এই লামিয়া মোর্শেদই কার্যত ‘ডি-ফ্যাক্টো’ প্রধান উপদেষ্টা, যাঁর পরামর্শ ছাড়া ড. ইউনূস কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁর দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এমন স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।
সূত্র মতে, এসব বিদেশ সফর ব্যক্তিগত হলেও খরচ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। বহুল আলোচিত লন্ডন সফরের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, প্লেনভর্তি সঙ্গী নিয়ে তিনি ওই সফরে অংশ নেন এবং ইউনূসের কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি সফরে লামিয়া মোর্শেদ অনুপস্থিত ছিলেন না।
গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস: জনশক্তি রপ্তানিতে সিন্ডিকেট অভিযোগ
বিতর্ক শুধু প্রশাসনেই নয়, জনশক্তি রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠদের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ মতে, লামিয়া মোর্শেদের নেতৃত্বে একটি নতুন সিন্ডিকেট জনশক্তি রপ্তানি খাতকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ড. ইউনূসের মালিকানাধীন ‘গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (GESL)’ ২০০৯ সালে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে বাতিল হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠানটি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে অনুমোদন পায়। এই অনুমোদনের পেছনে ড. ইউনূস ও লামিয়া মোর্শেদের রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, GESL জনশক্তি রপ্তানির নামে সিন্ডিকেট ব্যবসায় যুক্ত এবং দেশের অন্যান্য এজেন্সিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিএমইটি’র একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সিন্ডিকেট রাজত্ব এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে বিগত এক বছরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এখন শ্রমবাজারে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, “লামিয়া মোর্শেদকে সামনে রেখে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে যারা সরকারি সফরের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক জনশক্তি বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।”
অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইসাথে সরকারি পদ ব্যবহার করে বেসরকারি স্বার্থ চরিতার্থ করার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।
একজন বিশ্লেষক শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যদি এই সিন্ডিকেটিক নিয়ন্ত্রণ চলতেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জনশক্তি রপ্তানিতে স্বচ্ছতা থাকবে না। ইউনূসের প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বা সাহস কেউ দেখাতে পারবে না, কারণ রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তিনি একজন অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।”
আরো পড়ুন

