Sunday, November 30, 2025

ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ইউনূস

Share

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিভিন্ন দেশ সফর করে তিনি নিজের ব্যবসা পাকাপোক্ত করতে চাইছেন। আর এ মিশনে তিনি কাজে লাগাচ্ছেন তার বান্ধবী লামিয়া মোর্শেদকে।

গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অর্থপাচারসহ শতাধিক মামলা ছিল। এ প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূস বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যে তাঁর অসুস্থ স্ত্রী তাঁর সহায়তা ছাড়া চলতে, ফিরতে বা খেতে পারেন না, এবং তাঁকে জেলে পাঠানো হলে তাঁর স্ত্রীর মারাত্মক সমস্যা হবে। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই ‘অসুস্থ’ স্ত্রীকে বাংলাদেশে রেখেই তিনি একের পর এক বিদেশ সফর করছেন, যার মধ্যে অনেকগুলোই অপ্রয়োজনীয় বলে অভিযোগ উঠেছে। জনগণের অর্থ অপচয় করে তিনি এসব সফরে গেছেন।

সর্বশেষ তাঁর চলতি ইতালি সফরও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা হচ্ছে। ইতালির রোমে মেয়রের সাথে সাক্ষাতের সময়ও তাঁর পাশে দেখা গেছে লামিয়া মোর্শেদকে, যাকে ড. ইউনূসের ‘বান্ধবী’ বা ‘ফ্রেন্ড উইথ বেনিফিটস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লামিয়া মোর্শেদের সঙ্গে ইউনূসের এই ঘনিষ্ঠ আচরণ নিয়ে নেটিজেনরা নানারকম সমালোচনা করছেন।

সূত্র বলছে, দেশের স্বার্থ নয় বরং নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থেই ক্ষমতা নেওয়ার পর ১৪টি বিদেশ সফর করেছেন ইউনূস। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার উপদেষ্টাদের কথাতেই। সম্প্রতি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর হয়তো আমরা কেউ থাকবো না। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ এনজিও আপনাদের পাশে থাকবে সব সময়। কীভাবে গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা যায় সেজন্য ইউনূস বিভিন্ন বিদেশি শক্তির দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।

ইউনূসের ডি-ফ্যাক্টো’ প্রধান উপদেষ্টা লামিয়া মোর্শেদ!
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাতকে তোয়াক্কা না করে লামিয়া মোর্শেদকে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক বানানোর অভিযোগ উঠেছে। এই লামিয়া মোর্শেদই কার্যত ‘ডি-ফ্যাক্টো’ প্রধান উপদেষ্টা, যাঁর পরামর্শ ছাড়া ড. ইউনূস কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁর দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এমন স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।

সূত্র মতে, এসব বিদেশ সফর ব্যক্তিগত হলেও খরচ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। ইউনূসের কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি সফরে লামিয়া মোর্শেদ অনুপস্থিত ছিলেন না।

গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস: জনশক্তি রপ্তানিতে সিন্ডিকেট অভিযোগ
বিতর্ক শুধু প্রশাসনেই নয়, জনশক্তি রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠদের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ মতে, লামিয়া মোর্শেদের নেতৃত্বে একটি নতুন সিন্ডিকেট জনশক্তি রপ্তানি খাতকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

ড. ইউনূসের মালিকানাধীন ‘গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (GESL)’ ২০০৯ সালে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে বাতিল হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠানটি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে অনুমোদন পায়। এই অনুমোদনের পেছনে ড. ইউনূস ও লামিয়া মোর্শেদের রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, GESL জনশক্তি রপ্তানির নামে সিন্ডিকেট ব্যবসায় যুক্ত এবং দেশের অন্যান্য এজেন্সিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বিএমইটি’র একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সিন্ডিকেট রাজত্ব এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে বিগত এক বছরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এখন শ্রমবাজারে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, “লামিয়া মোর্শেদকে সামনে রেখে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে যারা সরকারি সফরের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক জনশক্তি বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।”

অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইসাথে সরকারি পদ ব্যবহার করে বেসরকারি স্বার্থ চরিতার্থ করার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।

ক্ষমতা নিয়েই অপব্যবহার করেছেন ইউনূস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতের পাঁচটি ও মানহানির অভিযোগে করা একটি মামলা বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে তার হাতে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে ধরণের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, সেটা নিয়েও নানান সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে।

তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার দুই মাসের মাথায় গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটিতে সরকারের যে ২৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব ছিল, সেটিও কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এর বাইরে, গ্রামীণের নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স প্রদান এবং গ্রামীণ টেলিকমকে যে ডিজিটাল ওয়ালেট সেবা প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে “স্বার্থের দ্বন্দ্ব” রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

তারা বলছেন, এসব ঘটনায় সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। এখন যদি আস্থার সূচক দেখা যায়, তাহলে প্রথমদিকে সরকারের প্রতি মানুষের যে আস্থা ছিল, প্রত্যাশা ছিল, সেটি কীভাবে নেমেছে বোঝা যাবে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত