Share
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন সবসময়ই ছিল ন্যায়বিচার, অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম চালিকাশক্তি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত, ছাত্রসমাজ ছিল জাতির বিবেকের প্রতীক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাচ্ছে,মেধা, আদর্শ আর ত্যাগের জায়গা দখল করছে টাকা, প্রভাব ও স্বার্থের রাজনীতি।
এক সময় শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিল “মেধা না কোটা” শ্লোগান তুলে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়ের দাবিতে। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, সেই আন্দোলনের বহু মুখই টাকার বিনিময়ে অবস্থান বদলাচ্ছে, মতাদর্শ বিকিয়ে দিচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নামে যে অরাজকতা একসময় দেশে তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগে দেশি-বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠী নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। আজ সেই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীরাই ক্ষমতার মোহে ও টাকার প্রলোভনে নিজেদের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত।
এখন মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন মেধা না টাকা?
যাদের বয়সে থাকা উচিত ছিল পাঠাগারে, গবেষণাগারে কিংবা চিন্তা-চর্চার জগতে, তারা আজ ব্যস্ত চাঁদাবাজি, তদবীর আর প্রভাব খাটানোর রাজনীতিতে। শিক্ষা ও জ্ঞানের পবিত্র অঙ্গন আজ নৈতিক অবক্ষয়ের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ এক গভীর সংকট। এখানে আর মেধা বা পরিশ্রমের মূল্য নেই বরং মূল্যায়িত হচ্ছে টাকার ক্ষমতা, সামাজিক যোগাযোগ আর রাজনৈতিক আনুগত্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংগঠনগুলো এখন প্রায়ই শিক্ষার চেয়ে চাঁদা তোলায় বেশি মনোযোগী। ফলাফল একটাই সৎ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালীরা দখল করছে নেতৃত্ব ও সুযোগের আসন।
এই অবক্ষয় শুধু ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে প্রশাসন, রাজনীতি ও পুরো সমাজে
যখন ছাত্ররা জ্ঞানার্জনের বদলে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার কৌশল শেখে, তখন পুরো জাতিই হারায় তার নৈতিক ভিত্তি। যাদের একদিন দেশ চালানোর কথা, তারা আজ দেশের সম্পদ ও মর্যাদা লুটে নেওয়ার কৌশল রপ্ত করছে।
অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, উদার ও বৈষম্যবিরোধী চিন্তাধারার অনেক শিক্ষার্থীও এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। তারা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছে না—বরং অন্যায়েরই অংশ হয়ে উঠছে। তাদের হাতে বই নয়, চাঁদার খাতা; তাদের ভাষায় যুক্তি নয়, বরং হুমকি ও প্রভাবের শব্দ।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সাহসী ও সৎ উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। চাঁদাবাজি, তদবীর ও টাকার প্রভাবমুক্ত একটি পরিবেশ ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে মেধা, পরিশ্রম ও নৈতিকতাই জীবনের প্রকৃত সম্পদ।
শিক্ষার্থী সমাজই জাতির ভবিষ্যৎ। যদি তারা জ্ঞানের পরিবর্তে টাকাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া কিছু নয়। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি “মেধার বাংলাদেশ” গড়ব, নাকি “টাকার বাংলাদেশ” তৈরি করব? জাতির পথ নির্ভর করছে সেই এক সিদ্ধান্তের ওপর মেধা বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
অবক্ষয়ের পেছনে দায় কার?
শিক্ষার্থীদের এই অবক্ষয়ের মূল দায় আজ বহন করছে বর্তমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী ইউনূস সরকার। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা শিক্ষা খাতকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের চর্চা ও মূল্যবোধের পরিবর্তে তারা ছড়িয়ে দিয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবীর ও পদোন্নতি বাণিজ্যের সংস্কৃতি। এই প্রজন্মকে মেধা থেকে দূরে সরিয়ে টাকার নেশায় আসক্ত করা হচ্ছে যাতে তারা ভাবতে না শেখে, প্রশ্ন না তোলে, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারে।
ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ মেধা নয়, অর্থ ও প্রভাবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এভাবে একটি সরকার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে যা কোনো জাতির জন্যই আত্মঘাতী। সময় এসেছে শিক্ষা ও শিক্ষার্থী উভয়কেই এই অন্ধকার চক্র থেকে মুক্ত করার। মেধা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম এই তিন মূল্যবোধেই পুনর্জাগরণ ঘটাতে পারলেই আবার জেগে উঠবে “মেধার বাংলাদেশ”।
আরো পড়ুন

