জুলাই–আগস্টের রক্তপাতের নেপথ্যে ইউনূস, জামায়াত ও বিদেশি প্রভাব

Share

নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই সময়কাল এক গভীর সংকট ও অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হলো। কোটাভিত্তিক দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্রী-ছাত্র্ত্ত্বাবস্থায় কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত আন্দোলন দ্রুতই বস্তুত একটি বৃহৎ রাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপ নিল; সেই সংঘর্ষে নগর-গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা, দলীয় নেতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীর খুন-খারাপি ঘটল। সরকারের পতনের দাবি, সামাজিক মাধ্যমের ঝুঁকিপূর্ণ গুজব ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়া এসবের মিশ্রণে ঘটনাগুলো এক শ্রেণির ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলে অনেকেই অভিহিত করেছেন।

দলের অভ্যন্তরীণ শত্রুতা, তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ও বিদেশি কৌশলের মিলিত প্রভাব এই তিনটি উপাদান এই সহিংসতাকে ত্বরান্বিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়া, কিছু স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা ও সীমিত সরকারি রিপোর্টগুলোতে নির্দেশ করা হয়েছে যে পাকিস্তানভিত্তিক কিছু জঙ্গি সংগঠন, স্থানীয় জামায়াত-শিবির ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মিলিত ষড়যন্ত্র ঘটনার নেপথ্য শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। একই সাথে অনলাইন প্রোপাগান্ডা ও সম্ভাব্য অর্থায়ন প্রশ্নগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে, যা জনমত তৈরিতে এবং বিভাজনের জন্ম দিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

তবে দায় নির্ধারণে সরাসরি অভিযোগ-প্রতিহিংসার চাকা চালানো সহজ নয়। নিহত সংখ্যা, ঘটনার ক্রমবিকাশ ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ এসব নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। সরকারি তালিকা, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি, হাসপাতাল নথি ও বিভিন্ন গণমাধ্যম রিপোর্টের সংমিশ্রণে পাওয়া চিত্র একরকম নয়; তাই কেবল জনরোষ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে না। আইনি প্রক্রিয়ার মৌলিক নীতিই হলো প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিচার, আর ন্যায়বিচার দিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে সেটাই জনগণের কপূর্ণরূপে মেনে চলা উচিৎ।

এ প্রেক্ষাপটে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত—একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া সত্যের সন্ধান অসম্ভব। তদন্তে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, মানবাধিকার সংস্থা ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা পাবে। ভিডিও এভিডেন্স, অটপসি রিপোর্ট, ডিএনএ টেস্টিং, দাখিল করা অভিযোগ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি এসব উপাদান বিচারিকভাবে যাচাই করা অত্যাবশ্যক। দ্বিতীয়ত—দলগত প্রতিশোধ বা সামাজিক বিচ্ছুরণ বন্ধ করে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনাই জরুরি। ন্যায়বিচারের বিকল্প হিসাবে রাস্তায় বা অনলাইন-ট্রোলিংয়ের মাধ্যমে কাউকে ‘দোষী’ আখ্যা দিয়ে সমাজে বিচার শুরু করলে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংঘাতকে তীব্র করবে।

বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ যদি সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়, তা জাতীয় সিকিউরিটি নীতিতে গভীর পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন বয়ে আনবে। বিদেশি গুপ্তচর সংস্থার দখলে তথ্য-প্রচার, অস্ত্র সরবরাহ বা অর্থায়ন— এসব যদি ধরা পরে, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্তরে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করে যথাযথ প্রতিকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে রাজনীতিকে আরও স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও সংঘর্ষমুক্ত করার উপায় হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের মান উন্নয়ন করতে হবে।

অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাঙন দূর করা ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি আটকানো কঠিন। শিক্ষাব্যবস্থা, যুবনীতি ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করে, ডিজইনফরমেশন রোধে প্রযুক্তিগত ও আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে, এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ ফিরিয়ে এনে নাগরিকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। পুলিশি কার্যক্রম ও নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব পালনেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে—তখনই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত, এ প্রাবল্যপূর্ণ শোক ও ক্ষতির পর আমরা একটি মৌলিক সত্যে ফিরে আসতেই হবে: কোনো জাতি প্রতিশোধে স্থিত থাকলে অগ্রসর হতে পারে না। বিচার চাইলে সেটা স্বচ্ছ, বৈধ ও মানবাধিকার সম্মত উপায়ে হতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ফলপ্রসূ তদন্ত প্রয়োগ করে জনগণের কাছে ফলাফল উপস্থাপন করতে হবে—এটিই হলো দেশের স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের একমাত্র পথ। বাংলাদেশকে কোনো বিদেশি এজেন্ডার পরীক্ষাগার হতে দেওয়া চলবে না; একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিভাজন উস্কে দিয়ে দেশকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা যদি হয়, তার বিরুদ্ধে আইনি ও কুটনৈতিকভাবে লড়াই করাও রাষ্ট্রের কর্তব্য।

রক্তপাতের দায় যে-ই থাকুক, দল, ব্যক্তি বা বিদেশি হোত ন্যায়ের পথেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জনগণ অধীর আগ্রহে প্রত্যাশা করছে। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হবে জাতির সেরার পথে ফেরার একমাত্র উত্তর।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত