Share
বান্দরবানের খ্রিস্টান সম্প্রদায় যখন প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছে যে তারা নিজ দেশে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ষড়যন্ত্র করছে না, তখন বুঝতে হবে এদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। শতাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে নিজেদের দেশপ্রেম প্রমাণ করতে যাচ্ছে, নিজেদের জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্ব নিয়ে সাফাই গাইতে যাচ্ছে। এটা কোন স্বাধীন দেশের চিত্র, নাকি এমন একটা রাষ্ট্রের ছবি যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপটে সংখ্যালঘুরা নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যস্ত থাকে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩.২৬ শতাংশ খ্রিস্টান। এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী নাকি এদেশে স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। হাস্যকর শোনালেও এই অপপ্রচার চলছে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ত্রিপুরা আর বম সম্প্রদায়ের মানুষ শত শত বছর ধরে খ্রিস্টধর্ম পালন করে আসছে, কিন্তু হঠাৎ করে তাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে একটা বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। কেন? কার স্বার্থে?
২০২৪ এর জুলাইয়ের পর থেকে এদেশে সংখ্যালঘুদের জীবন নরকে পরিণত হয়েছে। চার্চে বোমা হামলা হচ্ছে, তীর্থস্থান লুট হচ্ছে, কবরস্থান দখল হচ্ছে, বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হচ্ছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর হচ্ছে। এই নৈরাজ্যের মধ্যে মুহাম্মদ ইউনুসের তথাকথিত ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ কী করছে? কিছুই না। সম্পূর্ণ নীরব, সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।
একজন নোবেল বিজয়ী যিনি মানবাধিকারের কথা বলে সারা দুনিয়ায় সুনাম কুড়িয়েছেন, তিনি নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার দেখেও চুপ থাকতে পারেন? নাকি এটাই তার আসল চেহারা, যা এতদিন মাইক্রোক্রেডিটের মোড়কে ঢাকা ছিল?
ইউনুস যে প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দরকার আছে। জুলাইয়ে যে দাঙ্গা হলো, যে অরাজকতা সৃষ্টি হলো, তার পেছনে কারা ছিল সেটা এখন আর গোপন বিষয় নয়। একটা নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হলো একজন ব্যাংকারকে, যার রাজনৈতিক কোনো ম্যান্ডেট নেই, জনগণের ভোট নেই। এই সরকার এসেছে দাঙ্গার মধ্য দিয়ে, রক্তের মধ্য দিয়ে। আর এখন সেই সরকারের আমলেই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলছে প্রকাশ্যে।
বান্দরবানের মানববন্ধনে যারা কথা বলেছেন, তারা স্পষ্ট করেই বলেছেন যে প্রশাসন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। এটা কোনো নতুন অভিযোগ নয়, কিন্তু ইউনুস সরকারের আমলে এই বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। খ্রিস্টান মিশনারি আর দাতা সংস্থাগুলো যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর মানবিক উন্নয়নের কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরের অভিযোগ এনে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে। কেন? কারণ একটা সমাজে যখন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়ানো হয়, তখন তাদের ওপর আক্রমণ করা সহজ হয়ে যায়। আর এই সরকারের নীরবতা সেই আক্রমণকারীদের মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্মারকলিপিতে যা লেখা হয়েছে, তা পড়লে গা শিউরে ওঠে। সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা থাকলেও বাস্তবে খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় হয়রানির শিকার হচ্ছে। এটা শুধু সংবিধান লঙ্ঘন নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও সরাসরি লঙ্ঘন। কিন্তু যে সরকার নিজেই অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকার কি আইনের শাসন নিয়ে মাথা ঘামাবে?
ইউনুস সারা জীবন দরিদ্র মানুষকে ঋণ দিয়ে ব্যবসা করেছেন, নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু এখন যখন তিনি একটা দেশের হাল ধরেছেন, তখন তার দায়িত্ব শুধু ঋণ বিতরণ নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সংখ্যালঘুরা এই দেশের নাগরিক, তাদের রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে ইউনুস সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বরং তাদের নীরবতা এই অপপ্রচার আর নির্যাতনকে উৎসাহিত করছে বলেই মনে হয়।
জন ত্রিপুরা বলেছেন, ধর্মকে ঘিরে উস্কানিমূলক বার্তা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কে বন্ধ করবে? যে সরকার নিজেই সাম্প্রদায়িক শক্তির কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকার কি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? এটা যেন চোরকে দিয়ে চুরি ধরানোর মতো ব্যাপার।
বান্দরবানের খ্রিস্টানরা যখন বলছে যে বাইবেল নিয়ে ধর্মীয় আলোচনা করা মানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র নয়, তখন বুঝতে হবে কতটা অসহায় অবস্থায় তারা আছে। একটা সভ্য দেশে কাউকে এভাবে নিজের ধর্মীয় অধিকার ব্যাখ্যা করতে হয় না। কিন্তু ইউনুসের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতিটি পদক্ষেপ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির দায় কার? যারা মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের তো বটেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায় সেই সরকারের, যে সরকার এই অপপ্রচার বন্ধ করতে পারছে না, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
আরো পড়ুন

