Share
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর মুক্তমঞ্চে পাঁচ দশক ধরে হেলাল মিয়া গান গেয়েছেন। জন্মান্ধ এই মানুষটা আর তার আট সদস্যের পরিবার, সবাই দৃষ্টিহীন, মারফতি আর কাওয়ালি গেয়ে সম্মানের সঙ্গে রোজগার করেছেন। ভিক্ষা করেননি কখনো। কিন্তু গত ২৬ নভেম্বর কয়েকজন মাদরাসার ছাত্র এসে হুকুম দিয়ে গেল: গান বন্ধ করো, ভিক্ষা করো। না মানলে বাদ্যযন্ত্র ভাঙা হবে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে অবৈধ সরকার ক্ষমতায় বসানো হয়েছে, তার আসল চেহারা এখন দিনে দিনে প্রকাশ পাচ্ছে। একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত দাঙ্গার মধ্য দিয়ে, সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আর জামায়াত-শিবিরের মতো জঙ্গি সংগঠনের মাঠপর্যায়ের শক্তি ব্যবহার করে যে ক্যু সম্পন্ন হয়েছে, তার আসল উদ্দেশ্য এখন আর গোপন নেই। এরা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মুফতি মুবারক উল্লাহ যখন খোলাখুলি বলেন, “আমরা অনুমতি দিতে পারি না যে গান হোক; গান যেহেতু শরীয়তে নিষিদ্ধ,” তখন আর কোনো সংশয় থাকে না। এই লোকটা কোন শরীয়তের কথা বলছেন? বাংলার মাটিতে হাজার বছর ধরে যে ইসলাম চর্চিত হয়েছে, যেখানে লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ, দুদ্দু শাহ – এরকম হাজারো সাধক-কবি গানের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা করেছেন, সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে এই তথাকথিত শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা ওহাবি মতাদর্শ, যেটা আরব মরুভূমির একটা বিশেষ ধরনের চরমপন্থী ব্যাখ্যা। এই মতাদর্শ বাংলার নয়, বাঙালি মুসলমানের নয়।
কিন্তু জামায়াতে ইসলামী, যাদের সবাই জানে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে, তারা এই বিদেশি মতাদর্শকে এখানে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দশকের পর দশক কাজ করেছে। কেন? কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা। এরা জানে যে বাঙালির উদার, সুফিবাদী, সংস্কৃতিমুখী ইসলাম বহাল থাকলে তাদের কট্টরপন্থী রাজনীতি টিকবে না। তাই তারা সৌদি টাকায় সারাদেশে ওয়াহাবি মাদরাসা খুলেছে, মসজিদে ইমাম বসিয়েছে, তরুণদের মগজ ধোলাই করেছে। আর এখন ইউনুসের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা পেয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার খোলা মাঠ।
মুহাম্মদ ইউনুস কে? একজন সুদি মহাজন, যে গরিব মানুষকে উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে তাদের চিরকালের জন্য ঋণের ফাঁদে আটকে রাখার একটা ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেছে, আর সেই জন্য পেয়েছে নোবেল পুরস্কার। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সে একজন আদর্শ লোক, কারণ সে দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে আসলে দারিদ্র্যকে স্থায়ী করার একটা ব্যবস্থা দিয়েছে। এই লোক কখনোই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিল না। কিন্তু বিদেশি শক্তির কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে, আর সেই কারণেই তাকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।
জুলাইয়ের ঘটনা কোনো গণঅভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত ক্যু। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশে তাদের অনুগত একটা সরকার চেয়েছিল। নির্বাচিত সরকার তাদের সেই চাহিদা পূরণ করছিল না। তাই জামায়াত-শিবিরের মাঠপর্যায়ের ক্যাডার, হেফাজতের ধর্মীয় উন্মাদনা, আর সামরিক বাহিনীর একাংশের সহযোগিতায় সংঘটিত হলো একটা সফল ক্যু। আর এই ক্যু-এর মুখ হিসেবে বসানো হলো ইউনুসকে, কারণ তার আন্তর্জাতিক সুনাম আছে, আর সে বিদেশিদের অনুগত।
এখন এই অবৈধ সরকারের আমলে জামায়াত আর তার সহযোগী সংগঠনগুলো যা খুশি তাই করছে। হেলাল মিয়ার মতো একজন দৃষ্টিহীন মানুষকে গান গাইতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, আর পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কারণ তারা জানে যে এখন ক্ষমতায় যারা আছে, তারা এই ধরনের কাজকে সমর্থন করে। ইউনুস নিজে হয়তো গান-বাজনা নিয়ে সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু তার সরকার যাদের ক্ষমতা দিয়েছে, তারা এই কাজ করছে। আর এটাই তো ছিল পরিকল্পনা। জামায়াতকে ক্ষমতায় অংশীদার করে, তাদের মাধ্যমে দেশে একটা ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা।
পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে কী হয়েছে, আমরা সবাই দেখেছি। পাকিস্তানে জিয়াউল হকের আমলে ওহাবি মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সৌদি টাকায়। ফলাফল? সেখানে এখন সংস্কৃতি বলে কিছু নেই, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত সব প্রায় মৃত। জঙ্গিবাদ এখন সেখানে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর নারীদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সঙ্গীত নিষিদ্ধ, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর বাংলাদেশও এখন সেই পথেই হাঁটছে। হেলাল মিয়াকে গান বন্ধ করতে বলা, এটা শুধু একটা ঘটনা নয়। এটা একটা সিস্টেমেটিক ক্যাম্পেইনের অংশ।
যুক্তি দিয়ে বলা যাক। বাংলাদেশে ইসলাম এসেছে মূলত সুফি সাধকদের মাধ্যমে। হযরত শাহজালাল, খান জাহান আলী, বায়েজিদ বোস্তামী – এরা ছিলেন সুফিবাদের অনুসারী। সুফিবাদে সঙ্গীত, নৃত্য, কবিতা – এসব আধ্যাত্মিক চর্চার অংশ। কাওয়ালি তো সুফি ঐতিহ্যেরই একটা রূপ। অথচ এখন জামায়াত-হেফাজতের লোকেরা বলছে গান হারাম। তারা কোন ইসলামের কথা বলছে? এরা বলছে সেই ওহাবি মতবাদের কথা, যেটা ১৮ শতকে আরবের নজদ অঞ্চলে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নামে এক ব্যক্তি প্রচার শুরু করেছিল। সৌদি রাজপরিবার এই মতবাদকে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, আর তেলের টাকায় পুরো মুসলিম বিশ্বে এটা রপ্তানি করেছে।
বাংলাদেশে এই মতবাদ এসেছে আশির দশক থেকে। জিয়াউর রহমান যখন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা শুরু করলেন, তখন সৌদি টাকা আসা শুরু হলো। মাদরাসা খোলা হলো, ইমাম পাঠানো হলো। এরশাদ সেই নীতি অব্যাহত রাখলেন। খালেদা জিয়ার আমলে জামায়াতকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হলো। আর এভাবেই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড ভাঙার একটা প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক শক্তি এতই গভীর ছিল যে এই প্রক্রিয়া খুব বেশি সফল হয়নি। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে নানা সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত ছিল। কিন্তু এখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে চাইছে।
ইউনুস নিজে হয়তো ধর্মান্ধ নন। তিনি একজন সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী, যে বিদেশি প্রভুদের সেবা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চান। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে হলে তাকে জামায়াতের সমর্থন দরকার, কারণ তারাই মাঠপর্যায়ে তার সরকারের জন্য কাজ করছে। আর তার বিনিময়ে জামায়াত পাচ্ছে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ। হেলাল মিয়ার ওপর হামলা, এটা জামায়াত-হেফাজতের সেই এজেন্ডারই অংশ। তারা দেখতে চাইছে কতটা দূর যাওয়া যায়। একজন অন্ধ লোককে গান বন্ধ করতে বাধ্য করলে কেউ কিছু বলছে কিনা। পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে কিনা। সমাজ প্রতিবাদ করছে কিনা। যদি না করে, তাহলে পরের ধাপে যাওয়া যাবে।
এটাই তো তালেবানরাও করেছিল। প্রথমে ছোট ছোট নিষেধাজ্ঞা, তারপর ধীরে ধীরে বড়। প্রথমে গান, তারপর নাটক, সিনেমা, তারপর নারীদের শিক্ষা, তারপর নারীদের চলাফেরা। আর এখন সেখানে পুরোপুরি একটা মধ্যযুগীয় বর্বরতা চলছে। বাংলাদেশও কি সেই পথে যাচ্ছে? যেভাবে এই সরকার চলছে, তাতে সেই আশঙ্কাই বাস্তব হচ্ছে।
হেলাল মিয়া এখন আবার গান গাইছেন, কিন্তু ভয়ে। তার নিজের জায়গা হকাররা দখল করে নিয়েছে। পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হেফাজতের সভাপতি খোলাখুলি বলে দিয়েছে যে তারা গানের অনুমতি দেবে না। আর সরকার? নীরব। কারণ এই সরকার তো এই শক্তিগুলোর ওপরই নির্ভরশীল। জামায়াত আর হেফাজত ছাড়া ইউনুস সরকারের কোনো জনভিত্তি নেই। তাই তাদের খুশি রাখতে হবে। আর সেই খুশি রাখার মূল্য দিচ্ছে হেলাল মিয়ার মতো সাধারণ মানুষ।
এই দেশের জল-বায়ু, মাঠ-ঘাট সব এখন বিষিয়ে উঠছে। একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মানুষ জানে না কোথায় কী নিষিদ্ধ হবে। কোন কথা বললে গলা কাটা যাবে। এই অবস্থা কি আমরা মেনে নেব? একটা অবৈধ সরকার, যেটা ক্যু করে ক্ষমতায় এসেছে, যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে, বিদেশি মতাদর্শ চাপিয়ে দিচ্ছে, আর দেশকে আফগানিস্তানের পথে নিয়ে যাচ্ছে, এটা কি আমরা মেনে নেব?
আরো পড়ুন

