Share
বাংলাদেশের রপ্তানি আয় টানা চতুর্থ মাস কমে যাওয়ার এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতির জন্য এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নভেম্বরে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। এই ধারাবাহিক পতন শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি লাখো মানুষের জীবিকা আর দেশের ভবিষ্যতের সাথে জড়িত একটি বাস্তবতা।
জুলাই মাসে দেশব্যাপী যে রক্তাক্ত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার পেছনের শক্তিগুলো এখন দেশ চালানোর দায়িত্বে বসে আছে। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যেভাবে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে, তার ফলাফল এখন পরিষ্কার হয়ে উঠছে অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে। মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা দেশকে যে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তা আর লুকিয়ে রাখার উপায় নেই।
রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার মানে শুধু ডলারের অঙ্ক কমা নয়। এর মানে হলো গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করা লাখো শ্রমিকের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়া। ছোট আর মাঝারি উদ্যোক্তারা যারা রপ্তানির সাথে জড়িত, তাদের ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়া। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া। আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া। এক কথায়, পুরো অর্থনীতির চাকা থমকে যাওয়ার আশঙ্কা।
যারা জুলাইয়ের সেই অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল, তাদের পেছনে বিদেশি অর্থায়নের কথা এখন আর গোপন নেই। ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সংযোগ আর সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থন নিয়ে যেভাবে একটি বৈধ সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা এই দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ হলো এই অবৈধ ক্ষমতা দখলের পরবর্তী প্রভাব যা এখন দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন টের পাচ্ছে।
ইউনুস সাহেব একজন নোবেল বিজয়ী, ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তক হিসেবে তার আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে। কিন্তু এনজিও চালানো আর একটা দেশ চালানো কি এক জিনিস? ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের তত্ত্ব বলা আর একটি দেশের জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সামলানো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো বিষয়। মাইক্রোফাইন্যান্সের জগতে যত সফলতাই থাকুক, সেটা কোনো যোগ্যতা নয় দেশের মতো জটিল একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার।
টানা চার মাস রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। বৈশ্বিক বাজারের মন্দা, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, চাহিদা হ্রাস। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশের ভেতরে যে অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন ভাবছেন তাদের অর্থ নিরাপদ কিনা। ক্রেতারা ভাবছেন বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনা ঠিক হবে কিনা। আর দেশের ভেতরের উদ্যোক্তারা তো দিশেহারা। কোন নীতি কখন বদলে যাবে, কোন সিদ্ধান্ত কখন উল্টে যাবে, তার কোনো ঠিক নেই।
যে সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই সরকারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাক, অন্তত অর্থনৈতিক সূচকগুলো তখন স্থিতিশীল ছিল। রপ্তানি আয় বাড়ছিল, প্রবৃদ্ধির হার ভালো ছিল, বিনিয়োগ আসছিল। কিন্তু এখন? এখন প্রতিটা সূচক নিচের দিকে যাচ্ছে। আর যারা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, তারা এখন নানা অজুহাত খুঁজছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতির দোহাই দিচ্ছেন। আগের সরকারের দুর্নীতির কথা বলছেন। কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব নিতে রাজি নন।
সত্যি কথা হলো, একটা দেশের অর্থনীতি রাতারাতি ভেঙে পড়ে না। কিন্তু যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে, যখন বৈধতার প্রশ্ন থাকে, যখন নীতিনির্ধারণে স্পষ্টতা থাকে না, তখন ধীরে ধীরে সব কিছু ভেঙে পড়তে শুরু করে। রপ্তানি আয় কমা তার একটা লক্ষণ মাত্র। আরও বড় সংকট সামনে অপেক্ষা করছে যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে।
দেশের তৈরি পোশাক খাতের কথাই ধরা যাক। এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। লাখো পরিবার এই খাতের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু জুলাইয়ের পরে যে অরাজকতা হয়েছে, তাতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। অর্ডার বাতিল হয়েছে। বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প সোর্স খুঁজছেন। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত এসব দেশ বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিচ্ছে। আর আমরা বসে বসে দেখছি।
যারা এই অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন। এই কি চেয়েছিলেন? দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা কি লক্ষ্য ছিল? নাকি শুধু ক্ষমতা দখল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল? রপ্তানি আয় কমার মানে তো শুধু সরকারের আয় কমা নয়, এর মানে হলো সাধারণ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়া। যে শ্রমিক তার পরিবার চালায় কারখানায় কাজ করে, সে এখন চাকরি হারাচ্ছে। যে ব্যবসায়ী ছোট একটা এন্টারপ্রাইজ চালাতেন, তিনি এখন দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন।
সুদী মহাজন বলে যাকে উল্লেখ করা হচ্ছে, সেই ইউনুস সাহেবের মাইক্রোক্রেডিট মডেলও তো বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। গরিব মানুষকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে আরও গভীর ঋণের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ অনেকদিনের। অনেক গবেষণাই দেখিয়েছে যে মাইক্রোক্রেডিট আসলে দারিদ্র্য বিমোচন করে না, বরং মানুষকে ঋণের চক্রে আটকে ফেলে। আর এখন তিনি পুরো দেশকে একটা বিশাল অর্থনৈতিক ফাঁদে ফেলছেন।
বিদেশি অর্থায়নের কথাও অস্বীকার করা যায় না। যেসব দেশ আর সংস্থা এই অবৈধ ক্ষমতা দখলকে সমর্থন দিয়েছে, তাদের কি উদ্দেশ্য? তারা কি সত্যিই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর উন্নয়ন চায়? নাকি তাদের নিজস্ব স্বার্থ আছে এই অঞ্চলে? বাংলাদেশকে দুর্বল করে রাখা হয়তো কারো কারো লাভ। একটা শক্তিশালী, স্বাবলম্বী বাংলাদেশ হয়তো অনেকের জন্যই অসুবিধার।
সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থনের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনী দেশের একটি শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠান, কিন্তু যখন তারা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন দেশের ক্ষতি হয়। ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্র, অর্থনীতি, উন্নয়ন সব কিছুতেই বিপর্যয় নেমে এসেছে। বাংলাদেশও এখন সেই পথে হাঁটছে মনে হচ্ছে।
অর্থনীতির ভিত্তিই হলো আস্থা আর স্থিতিশীলতা। বিনিয়োগকারীরা, ব্যবসায়ীরা, এমনকি সাধারণ মানুষও যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত থাকে, তখনই অর্থনীতি এগিয়ে যায়। কিন্তু এখন বাংলাদেশে সেই আস্থা আর স্থিতিশীলতা নেই। প্রতিদিন নতুন নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। আজ একটা সিদ্ধান্ত, কাল তা বদলে যাচ্ছে। কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই।
রপ্তানি আয় কমা শুধু একটা লক্ষণ, আসল সমস্যা আরও গভীরে। দেশের রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব, নীতিনির্ধারণে অস্পষ্টতা, এসব মিলিয়ে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। যারা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে, যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশের অর্থনীতি এখন পুরোপুরি গুঁড়িয়ে যাওয়ার পথে। রপ্তানি আয় কমছে, বিনিয়োগ কমছে, চাকরি যাচ্ছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আর যারা এই দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা কোনো জবাবদিহিতা দেখাচ্ছেন না। তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। দেশ আর দেশের মানুষ তাদের কাছে মূল্যহীন।
একটা দেশ কতটা নিচে নামতে পারে, সেটা এখন দেখার অপেক্ষা। টানা চতুর্থ মাস রপ্তানি আয় কমা শুধু একটা সংকেত যে আরও বড় বিপর্যয় আসছে। কিন্তু যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের কোনো চিন্তা নেই। তারা ব্যস্ত নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে। দেশের ভবিষ্যৎ তাদের কাছে কোনো বিষয়ই নয়।
আরো পড়ুন

