Share
বরিশালের সাগরদী খালের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বধ্যভূমি কমপ্লেক্সটি এখন কেবলই একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা। যেখানে একসময় দর্শনার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা অনুভব করতে পারতেন, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা আর অবহেলার চিহ্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি ভাঙচুরের শিকার হয়েছে, লুট হয়েছে। অথচ যে তথাকথিত সংস্কারের নামে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে, সেই অবৈধ সরকারের তরফ থেকে এর সংরক্ষণে কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার নেতৃত্বাধীন যে কাঠামো দেশ পরিচালনা করছে, তাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা এখন আর কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। একটি নির্বাচিত সরকারকে সহিংসতার মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসা যেকোনো কাঠামোই অবৈধ। জুলাই মাসে যে দাঙ্গা এবং সহিংসতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটেছে, তার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন, চরমপন্থী গোষ্ঠীর সহায়তা এবং সামরিক মদদের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে একটি মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমির অবহেলা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি আদর্শিক অবস্থানেরও প্রকাশ।
বরিশালের এই বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্যাতন করেছে, হত্যা করেছে নিরীহ বাঙালিদের। সেই স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য চার কোটি টাকা খরচ করে কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে টর্চার সেলের ভেতর নির্যাতনের আর্তনাদের সাউন্ড বাজত, যাতে নতুন প্রজন্ম অনুভব করতে পারে কী নৃশংসতার মধ্য দিয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর সেই সাউন্ড সিস্টেম লুট হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে লাইট এবং অন্যান্য সরঞ্জাম। এরপর সেপ্টেম্বরে আবারও হামলা হয়েছে, দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি লেখা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো ঘটেছে যখন ইউনূস এবং তার দল ক্ষমতা দখলের জন্য রক্তের হোলিখেলায় মত্ত।
যে সরকার সংস্কারের নামে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে প্রশ্ন করা যায়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা করা কি তাদের অগ্রাধিকারে নেই? নাকি যে শক্তিগুলোর সমর্থনে তারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের আদর্শের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাংঘর্ষিক বলেই এই উদাসীনতা? ইসলামিক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। তাদের সহায়তা নিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তারা কি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে আন্তরিক হতে পারেন?
বীর মুক্তিযোদ্ধা এএমজি কবীর ভুলু, যিনি ওয়াপদা কলোনিতে টানা ১৯ দিন নির্যাতনের শিকার ছিলেন, তিনি সেই ভয়াবহতার কথা বলতে গিয়ে এখনও কাঁদেন। তার মতো হাজারো মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই দেশ। তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু যে সরকার সাংবিধানিক পথে ক্ষমতায় আসেনি, যাদের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের কাছে এই নৈতিক দায়বদ্ধতা আশা করা কি বাস্তবসম্মত?
সুদী মহাজন হিসেবে ইউনূসের পরিচয় তার মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম থেকে এসেছে, যেখানে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ আদায় করা হয়েছে। নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে তার সমালোচনা করা যাবে না, এমন ধারণা হাস্যকর। তার নেতৃত্বে যে কাঠামো দেশ চালাচ্ছে, সেটি একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সহিংসতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই অবৈধতার দাগ কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে মোছা যায় না।
বধ্যভূমি কমপ্লেক্সের অবহেলা কেবল একটি স্থাপনার অবহেলা নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবহেলা। যে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, যে সরকার সহিংসতা এবং বিদেশি মদদে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ রক্ষার প্রত্যাশা করা বোকামি। ইউনূস এবং তার দল যদি সত্যিই দেশের স্বার্থে কাজ করতেন, তাহলে প্রথম কাজ হতো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করা, যেসব স্থাপনা ভাঙচুরের শিকার হয়েছে সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা।
কিন্তু আমরা দেখছি উল্টো চিত্র। বধ্যভূমিতে হামলা হয়েছে, লুটপাট হয়েছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করা হয়েছে, দেয়ালে কটূক্তি লেখা হয়েছে, কিন্তু এসবের তদন্ত নেই। এই নীরবতা কি ইঙ্গিত দেয় না যে যারা এই অবৈধ সরকারকে সমর্থন করছে, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল এবং এখনও আছে?
ইতিহাস মনে রাখবে কে কোন সময়ে কোন পাশে দাঁড়িয়েছিল। বরিশালের বধ্যভূমি এখন অবহেলায় পড়ে থাকলেও, যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের ত্যাগ বিস্মৃত হবে না। কিন্তু যে সরকার এই স্মৃতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের ব্যর্থতা এবং উদাসীনতাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে। একটি অবৈধ সরকারের কাছ থেকে নৈতিকতা আশা করা যায় না, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড নথিভুক্ত করে রাখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে কারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
আরো পড়ুন

