Share
কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামের যে লোকটা সোশ্যাল মিডিয়ায় একাত্তরের প্রজন্মকে নিকৃষ্টতম বলে গালাগাল করছেন, তার বক্তব্য শুনলে পরিষ্কার বোঝা যায় তিনি আসলে কাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের সেই পুরনো বয়ান, যেখানে মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় ভারতীয় ষড়যন্ত্র, স্বাধীনতাকে বলা হয় অপ্রয়োজনীয়, আর ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগকে বলা হয় মিথ্যা। এই একই বয়ান তো ১৯৭১ সালে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী আর সাঈদীরা দিয়েছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের পেছনে ছিল, আর এখন আছে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় বসা একটি অবৈধ সরকার।
ইব্রাহিম সাহেব বলছেন, ১৯৪৭ সালেই নাকি আমরা স্বাধীন হয়ে গেছি, তাহলে ১৯৭১ সালে আবার স্বাধীনতার কী দরকার ছিল? তিনি নামাজের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, জোহর পড়ার পর আবার জোহর পড়া শয়তানি। কিন্তু যে মানুষটা এমন কথা বলছেন, তিনি কি জানেন না ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেন হয়েছিল? পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল বলেই রফিক, সালাম, বরকত, জব্বাররা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালিরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও ক্ষমতা পায়নি কেন? কারণ পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের মানুষ বলেই মনে করত না। ২৫ মার্চের কালরাতে অপারেশন সার্চলাইট চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করা হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছিল, এগুলো কি মিথ্যা?
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোনো ভারতীয় ষড়যন্ত্র ছিল না। এটা ছিল বাঙালির নিজস্ব অধিকার আদায়ের লড়াই, টিক্কা খানদের জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। হ্যাঁ, ভারত আমাদের সাহায্য করেছিল, কিন্তু যুদ্ধটা লড়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক। ক্যাডেট কর্নেল তাহের, মেজর জিয়া, মেজর জলিল, মেজর শফিউল্লাহ, কর্নেল ওসমানীরা যখন সেক্টর কমান্ডার হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন, তখন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে রাজাকার বাহিনী গঠন করেছিল। যেসব বুদ্ধিজীবীদের ১৪ ডিসেম্বর রাতে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, সেই হত্যাকাণ্ডে জামায়াত নেতাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল। এগুলো কোনো গল্প নয়, এগুলো নথিবদ্ধ ইতিহাস।
কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সঠিক মামলা ছিল। তিনি কি জানেন না সেই মামলা ছিল পুরোটাই বানোয়াট, যার উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলানো? গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান সেই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এসব তথ্য তো ইব্রাহিম সাহেবের জানার কথা নয়, কারণ তিনি তো ইতিহাস পড়েননি, পড়েছেন জামায়াতের প্রচারপত্র।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, এই লোক ড. ইউনূসকে সমর্থন করছেন, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি সুপরিকল্পিত দাঙ্গার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছেন। সেই আন্দোলনে কারা ছিল? ছাত্র শিবির, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এবং আরও বেশ কিছু ইসলামী জঙ্গি সংগঠন। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, ওই আন্দোলনে বিদেশি অর্থায়ন ছিল, সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থন ছিল। একটি নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে একজন অনির্বাচিত ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে, যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা আদায় করে ধনী হয়েছেন। এই লোকটাই এখন গণতন্ত্রের ত্রাণকর্তা সেজে বসে আছেন, আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে পুরোদমে।
ইব্রাহিম সাহেব বলছেন, ভারতের যারা বন্ধু তারা নাকি বাংলাদেশের শত্রু। এই কথাটা শুনলেই বোঝা যায়, তিনি কোন দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে চান। ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, তারা এখনো সেই একই অবস্থানে আছে। পাকিস্তান এখন দুর্বল, তাই তারা নতুন প্রভুর খোঁজ করছে। কখনো সেটা চীন, কখনো আমেরিকা, কখনো অন্য কোনো শক্তি। কিন্তু তাদের শত্রু একটাই, সেটা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
এই মোল্লা সাহেব যখন বলেন একাত্তরের প্রজন্ম মিথ্যুক, তখন তিনি আসলে কাদের মিথ্যুক বলছেন? যেসব মা তাদের সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন, যেসব বোনেরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যেসব কৃষক তাদের লাঙল ফেলে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তাদের সবাইকে তিনি মিথ্যুক বলছেন? সেই প্রজন্ম যদি মিথ্যুক হয়, তাহলে সত্যবাদী কারা? নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, সাঈদী, কাদের মোল্লারা? যাদের বিচার হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, যাদের অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে নথিতে, সাক্ষীদের জবানবন্দিতে?
ধর্মের নামে এই ধরনের বিষবাক্য ছড়ানো মানুষগুলো আসলে ধর্মের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইসলাম ধর্মে মিথ্যা বলাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু এই তথাকথিত ইসলামী বক্তা প্রকাশ্যে মিথ্যাচার করছেন, ইতিহাস বিকৃত করছেন, লাখো শহীদের স্মৃতিকে অপমান করছেন। কোন ইসলাম তাকে এই অধিকার দিয়েছে? কোন ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে যে, গণহত্যাকারীদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে?
আবদুল হাকিম তার বঙ্গবাণী কবিতায় লিখেছিলেন, “যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।” কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম শুধু বঙ্গবাণীকেই ঘৃণা করেন না, তিনি ঘৃণা করেন এই দেশের স্বাধীনতাকে, এই মাটির মানুষদের, তাদের আত্মত্যাগকে। তার জন্ম কোথায়, সেটা তার কথা শুনলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কারণ যে মানুষ নিজের দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের গালাগাল করে, সে আসলে এই মাটির সন্তান নয়, সে হলো সেই ঘাতকদের উত্তরসূরি, যারা একাত্তরে বাঙালি হত্যায় মেতেছিল।
জুলাইয়ের দাঙ্গার পর এসব মানুষ আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছে, এবার তাদের সময় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে, শহীদদের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে, আর পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি আবার চালু করা যাবে। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাস ভোলেনি। একাত্তরের চেতনা এখনো এই দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে জ্বলছে। সুদী মহাজন ইউনূস আর তার ইসলামী জঙ্গি মিত্ররা যতই চেষ্টা করুক, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার অধিকার কারও নেই। যারা একাত্তরে পাকিস্তানিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বিচার হয়েছে, আবার হবে। কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং তার মতো যারা মুক্তিযুদ্ধকে মিথ্যা বলে, তাদের বুঝতে হবে, এই দেশে তাদের জায়গা নেই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে, আর এই দেশ চলবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। রাজাকারদের বংশধররা যতই চেষ্টা করুক, ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরানো সম্ভব নয়।
আরো পড়ুন

