ব্র্যাকের যক্ষ্মা জালিয়াতি : এনজিও সাম্রাজ্যের প্রকৃত রূপ দিনাজপুরে

Share

দিনাজপুরে ব্র্যাক যা করেছে, সেটা নিয়ে যদি কারো চোখ বন্ধ থাকে তাহলে বুঝতে হবে হয় সে অন্ধ নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে দেখছে না। সুস্থ মানুষকে জোর করে যক্ষ্মারোগী বানানোর এই পরিকল্পিত অপরাধ যখন ধরা পড়ল, তখন প্রশ্ন একটাই – কতদিন ধরে এই খেলা চলছিল? এবং শুধু দিনাজপুরে, নাকি সারাদেশে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো সিভিল সার্জনের প্রতিবেদনে যেটা উঠে এসেছে সেটা হচ্ছে পরিকল্পিত জালিয়াতির নীলনকশা। যার যক্ষ্মা নেই তাকে রোগী বানাতে হলে কফের নমুনায় গরমিল করতে হয়। আর সেটাই করা হয়েছে পদ্ধতিগতভাবে। আসল রোগীর কফ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে সুস্থ মানুষের নমুনায়। তারপর রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে, আর সেই সুস্থ মানুষ রাতারাতি হয়ে গেছে যক্ষ্মারোগী। তাকে দেওয়া হয়েছে এমন ওষুধ যার মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। লিভার-কিডনিতে চাপ পড়ে এসব ওষুধে। কিন্তু সেসব নিয়ে কার মাথাব্যথা? রোগীর সংখ্যা বাড়াতে হবে, প্রকল্পের বাজেট জাস্টিফাই করতে হবে, বিদেশি দাতাদের কাছে রিপোর্ট দেখাতে হবে।

একদিনের অভিযানে ব্র্যাক ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে পরিত্যক্ত ওষুধ আর ওষুধের পাত্র বের হলো। স্টক লেজার ঘষামাজা করা হয়েছে। ভুয়া রোগী তৈরি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি যখন প্রশ্ন করতে গেল, তখন আক্রমণাত্মক আচরণ করা হলো। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সব দেখলেন, আর ব্র্যাকের জেলা ব্যবস্থাপককে জরিমানা করলেন মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা। চল্লিশ হাজার টাকা! যে সংস্থা কোটি কোটি টাকার প্রকল্প চালায়, তাদের জন্য এটা কী? পকেটের খুচরো।

আসল প্রশ্ন হলো, কেন এই জালিয়াতি? সিভিল সার্জন নিজেই বলেছেন – রোগীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। যত বেশি রোগী দেখাতে পারবেন, তত বেশি অনুদান আসবে বিদেশ থেকে। তত বড় প্রকল্প হবে। তত বেশি লোক নিয়োগ হবে। তত বেশি বেতন-ভাতা হবে। এই পুরো কারবার চলে সংখ্যা নিয়ে। মানুষ এখানে শুধুই পরিসংখ্যান। কারো যক্ষ্মা আছে কি নেই, কারো শরীরে বিষক্রিয়া হচ্ছে কি না, সেটা দেখার সময় কারো নেই।

এনজিও ব্যবসার এই খেলাটা নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশক ধরে এভাবেই চলছে। দাতা সংস্থাগুলো টাকা দেয় নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য। লক্ষ্য পূরণ হোক আর না হোক, কাগজে-কলমে দেখাতে হয় যে হয়েছে। তাই বানানো হয় ভুয়া তথ্য। বানানো হয় ভুয়া রোগী। এভাবেই টিকে থাকে পুরো ব্যবস্থাটা।

দিনাজপুরে যা ধরা পড়েছে, তা হয়তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। বাকি ৬৩ জেলায় কী হচ্ছে? সিভিল সার্জন তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, যক্ষ্মা কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা আর তথ্যগত অসংগতি দেখেই তারা নজরদারি শুরু করেন। মানে এর আগেও সন্দেহ ছিল। আর সন্দেহের ভিত্তিতে যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত গেল, তখনই সব বেরিয়ে এলো।

মজার ব্যাপার হলো, অভিযানের পর ব্র্যাক দিনাজপুরের সব উপজেলায় সব ধরনের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। এটা কেমন কথা? জনস্বাস্থ্যের জন্য কাজ করার কথা, আর যখন জবাবদিহির মুখে পড়লেন তখন গুটিয়ে নিলেন? এটা তো জিম্মি করার কৌশল। মানুষকে বলা হচ্ছে, দেখো, তোমরা আমাদের প্রশ্ন করলে সেবা পাবে না। এই যে অহংকার, এই যে দায়হীনতা, এটা কোথা থেকে আসে? আসে সেই জায়গা থেকে যেখানে ক্ষমতা আর পৃষ্ঠপোষকতা আছে।

মুহাম্মদ ইউনুস যখন দেশের প্রধান উপদেষ্টা, যখন তার এনজিও সাম্রাজ্যের লোকজন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে, তখন ব্র্যাক বা গ্রামীণের মতো সংগঠনগুলোর কোনো ভয় থাকার কথা নয়। একটা আরেকটাকে বাঁচাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ এরা সবাই একই গোষ্ঠীর অংশ। একই স্বার্থ, একই লক্ষ্য। আর সেই স্বার্থের জায়গা থেকেই গরীব মানুষের নামে ব্যবসা চলে দশকের পর দশক।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই জালিয়াতির দায় কার? শুধু ব্র্যাকের জেলা ব্যবস্থাপকের? নাকি পুরো সিস্টেমের? যে সিস্টেম বিদেশি অনুদানের টাকায় চলে, যেখানে জবাবদিহিতা বলে কিছু নেই, যেখানে স্বচ্ছতা একটা বড় রসিকতা মাত্র? সেনাপ্রধান ওয়াকার যে সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন, সেই সরকারের মাথায় বসে আছেন এনজিও সম্রাট নিজে। তার অধীনে এই ধরনের কাণ্ড চলবে না তো কী হবে?

দিনাজপুরের ঘটনাটা একটা আয়না। সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে পুরো এনজিও ব্যবসার নোংরা চেহারা। যেখানে মানুষের দুর্দশা হচ্ছে পুঁজি, যেখানে রোগ হচ্ছে ব্যবসার উপকরণ, যেখানে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে লাভের খাতা মোটা করা হয়। আর এই পুরো নাটকের পরিচালক যারা, তারা এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। তাহলে বাকিটা কল্পনা করে নিন।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত